যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী প্রো-ইসরাইল লবি সংগঠন আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (এআইপ্যাক) রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দেশটিতে ক্রমেই বাড়ছে বিতর্ক ও জনঅসন্তোষ। একসময় এআইপ্যাকের সমর্থন কোনো প্রার্থীর নির্বাচনি সাফল্যের বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও, বর্তমানে অনেক নির্বাচনি এলাকায় সেটিই উল্টো রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট প্রার্থীদের টেলিভিশন বিতর্কে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে আসে। বিতর্ক শুরু হওয়ার মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই এআইপ্যাকের প্রসঙ্গ তোলেন প্রগতিশীল প্রার্থী ও সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল এল-সাইয়েদ। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী চারবারের কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে এআইপ্যাক তথা প্রো-ইসরাইল লবি সংগঠনের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল বলে অভিযোগ করেন।
এল-সাইয়েদ বলেন, আমাদের মধ্যে পার্থক্য হলো এআইপ্যাকের ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ব্যয়। অর্থাৎ আমারা ইসরাইলি লবি সংগঠনের টাকায় নির্বাচন করি না, আর আমার প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের টাকায় নির্বাচন করেন। ইসরাইলি লবি সংগঠন জানে, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের পক্ষে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করবেন, তাই এই রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
যদিও হ্যালি স্টিভেন্স অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি শুধুমাত্র মিশিগানের জনগণের কাছেই দায়বদ্ধ, তবে বিশ্লেষকদের মতে, মঙ্গলবারের প্রাইমারি নির্বাচনে এ ইস্যু ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রো-ইসরায়েল লবি হিসেবে পরিচিত এআইপ্যাক চলতি বছরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রাইমারি নির্বাচনে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করেছে। তবে গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বৃদ্ধির পর সংগঠনটি এখন বাম ও ডান উভয় রাজনৈতিক শিবিরের সমালোচনার মুখে পড়েছে।
সমালোচকদের একাংশের মতে, এআইপ্যাক যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর অতিরিক্ত প্রভাবের প্রতীক। অন্যদিকে অনেকে সংগঠনটিকে ইসরাইলের কট্টরপন্থী সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারকারী একটি লবি হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর রক্ষণশীল মহলেও এআইপ্যাকবিরোধী অবস্থান আরো জোরালো হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক সন্ত্রাসবিরোধী প্রধান জো কেন্ট দাবি করেন, ইসরাইল এবং তাদের শক্তিশালী মার্কিন লবির চাপের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে জড়িয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটির একটি ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতেও এআইপ্যাকের সমর্থন বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। সেখানে সাবেক সিটি কম্পট্রোলার ব্র্যাড ল্যান্ডার প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস সদস্য ড্যান গোল্ডম্যানের এআইপ্যাক-ঘনিষ্ঠতাকে প্রচারের মূল বিষয় বানান। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ল্যান্ডার বলেন, ওয়াল স্ট্রিট, ক্রিপ্টো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত এবং এআইপ্যাকের অর্থ নেওয়া প্রার্থীদের প্রতি ভোটারদের বিরক্তি তৈরি হয়েছে।
চলতি নির্বাচনি চক্রে এআইপ্যাক ৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে। সংগঠনটির সহযোগী সুপার প্যাক ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্টের তহবিলে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার ছিল। এই তহবিলে অবদান রাখা ধনকুবেরদের মধ্যে রয়েছেন এলিয়ট ম্যানেজমেন্টের পল সিঙ্গার এবং অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী মার্ক রোয়ান।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এআইপ্যাক এখনও অন্যতম শক্তিশালী লবি হলেও, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলকে ঘিরে জনমতের পরিবর্তনের কারণে সংগঠনটির রাজনৈতিক প্রভাব এখন নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সূত্র: ফিনান্সিয়াল টাইমস
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


