বিজেপির ‘বন্দে মাতরম’ রাজনীতির তিনটি ভুল

বিজেপির ‘বন্দে মাতরম’ রাজনীতির তিনটি ভুল
এআই দ্বারা নির্মিত ছবি।

ভারতের রাজনৈতিক মহলে বর্তমানে এমন জোরালো আলোচনা চলছে যে, জাতীয়তাবাদ বিশেষ করে জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’ ইস্যুতে বিজেপি আবার কংগ্রেসকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। স্বাধীনতা দিবসের সরকারি পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে কেরালার কংগ্রেসদলীয় মুখ্যমন্ত্রী ভি. ডি সতীশন জাতীয় সংগীত বাদ দিয়েছিলেন। অথচ কংগ্রেস-শাসিত অন্য তিনটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডি. কে. শিবকুমার, রেবন্থ রেড্ডি এবং সুখবিন্দর সিং সুখু অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মেনে ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয়টি স্তবকই গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এদিকে, নয়াদিল্লিতে কংগ্রেস সদর দপ্তরে যখন গানটি দ্বিতীয় স্তবক পেরিয়ে আরো এগিয়ে গেল, তখন উপস্থিত সবার মুখেই অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী এবং মল্লিকার্জুন খাড়গেÑসবারই বিরক্তি বা অস্বস্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। ছয় স্তবকের জাতীয় সংগীত নিয়ে কংগ্রেস তখন রীতিমতো দিশাহারা।

বিজ্ঞাপন

বিজেপি বিষয়টি ভালোভাবেই উপভোগ করেছে। জাতীয়তাবাদ বা ধর্মের মতো বিষয় এলে কংগ্রেস যে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনে, তা আবার প্রমাণিত হলো। আর এখানে এ দুটি বিষয়েরই সংমিশ্রণ ছিল। পরে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি যখন ‘বন্দে মাতরম’-এর মূল দুটি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানাল, তখন বিজেপি আরো জোরালো আক্রমণ করল কংগ্রেসকে। তারা দলটির বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ তুলল, কারণ গানটির পঞ্চম স্তবকে হিন্দু দেবী দুর্গা, কমলা (লক্ষ্মী) এবং বাণীর (সরস্বতী) কথা উল্লেখ আছে।

শনিবার যখন বিজেপির নবনিযুক্ত কর্মকর্তারা দলের সদর দপ্তরে মিলিত হলেন, তখন ছয় স্তবকের জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় অধিকাংশ নেতাই শুধু ঠোঁট মেলাচ্ছিলেন। অন্যের জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রশ্ন তোলা সহজ, কিন্তু ছয়টি স্তবক মুখস্থ রাখার জন্য প্রয়োজন প্রকৃত বিশ্বাস ও নিষ্ঠা। তবে এ কথা বলতেই হয়, সরকার ও বিজেপি ‘তেলাপোকা’র (cockroaches) কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর যে শিক্ষাটি নিয়েছেÑঅর্থাৎ রাজনীতিতে লোকদেখানো জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক মেরূকরণের ওপর আরো জোর দেওয়া প্রয়োজন, তা আসলে ভুল শিক্ষা। এই দৃষ্টিভঙ্গি অন্তত তিনটি কারণে সমস্যা তৈরি করবে।

ভারতের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা

প্রথমত, এটি ইঙ্গিত দেয়, তারা পরিস্থিতির প্রতিকূল হাওয়া বা আসন্ন চ্যালেঞ্জগুলো দেখতে অস্বীকার করছে। রবিবার যখন আমি এই লেখাটি লিখছিলাম, তখন টেবিলের উপর গত দুদিনের খবরের কাগজের শিরোনামগুলোর দিকে চোখ পড়ল। একটি শিরোনাম ছিলÑ ‘রাষ্ট্রপতি ভবন কর্তৃক তারেক রহমানের সফরবিষয়ক বিবৃতি ঘোষণা ও পরে তা প্রত্যাহার’। রাষ্ট্রপতির কার্যালয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের কথা ঘোষণা করেছিল, কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টা পরেই তা প্রত্যাহার করে নেয়।

রবিবার সন্ধ্যায় নিউজরুমে এই অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সময় এক সহকর্মী রসিকতা করে বললেন, ‘ডান হাত কী করছে তা বাম হাত জানত না।’ মনমোহন সিংয়ের সরকারের সময় বিশেষ করে তাদের দ্বিতীয় মেয়াদে এমনটা প্রায়ই ঘটত। মোদি সরকারের ক্ষেত্রে এমনটা কখন শুরু হলো? রাষ্ট্রপতি ভবনের ওই ভুল পদক্ষেপটি শুধু এ বিষয়টির দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করল যে, ঢাকা নয়াদিল্লিকে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে রেখেছে। আমরা তাদের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানালাম, আর তারা এমন প্রতিক্রিয়া দেখাল! আমাদের ‘বিশ্বগুরু’র ভাবমূর্তি তো এভাবে ধসে পড়তে পারে না!

আমি একটি হিন্দি পত্রিকা হাতে নিলাম। এর প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে একটি শিরোনাম ছিলÑ‘উৎসবের আগে চিনির দাম আকাশচুম্বী : প্রতি কেজি ৭০ টাকায় বিক্রি, এক মাসে বেড়েছে ১৭ টাকা।’ আরেকটি হিন্দি পত্রিকা খুলতেই চোখে পড়ল আরো একটি চাঞ্চল্যকর শিরোনাম : ‘থানায় সাত ঘণ্টা ধরে ধরনায় বসলেন রাহুল, এরপরই ২০০টি পেলেট বা ছররা গুলিতে আহত যুবকের এফআইআর নথিভুক্ত করা হলো।’

অর্থাৎ, জাতীয় রাজধানীতেও একটি এফআইআর করার জন্য সাধারণ মানুষকে বিরোধীদলীয় নেতার সাহায্য নিতে হচ্ছে! এর মাধ্যমে কী বার্তা গেল। ভাবলাম, প্রথম পাতার খবরগুলো হয়তো একটু বেশিই চড়া সুরের। তাই ভেতরের পাতাগুলো দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাণিজ্য পাতার ওপরের দিকে আরেকটি শিরোনাম ছিল : ‘ভ্রমণ থেকে রান্নাঘরÑসর্বত্রই মুদ্রাস্ফীতির আঁচ : চাল, বিস্কুট, গাড়ি, টায়ার ও রঙের দাম ১৮ শতাংশ বেড়েছে।’ প্রথম পাতার আরেকটি শিরোনাম ছিল : ‘কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োগের বাস্তবতা : গত এক দশকে শূন্যপদের সংখ্যা ৪ দশমিক ২ লাখ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ২৪ লাখে দাঁড়িয়েছে।’

এসব খবরের ভিড়ে ‘বন্দে মাতরম’-সংক্রান্ত শিরোনামটি কোথায় মানায়? সাধারণ মানুষের জীবনে যা ঘটছে এবং যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা বিষয়টিকে যেভাবে দেখছেনÑএর মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। সরকার ও বিজেপি পরিচালনাকারীরা কি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, ১২ বছরের শাসনকাল নিয়ে মানুষের মনে যেসব প্রশ্ন রয়েছে, তার সবকিছুর উত্তর শুধু অতিরিক্ত চারটি স্তবক যোগ করলেই পাওয়া যাবে?

‘জেন-জি’র ভাষায় বলতে গেলে, এটি এক ধরনের অবাস্তব বা বিভ্রান্তিকর রাজনীতি। যারা সবকিছু পরিচালনা করছেন, তারা যদি বিষয়টি জানেনই, তবে কেন তারা জাতীয় সংগীত নিয়ে পড়ে আছেন? তার চেয়ে বরং শাসনকাজ এবং সেসব সমস্যার সমাধানে শক্তি নিয়োগ করা উচিত নয় কি, যেসব কারণে মানুষ আজ প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে? বিজেপি সরকারের এ ধরনের আচরণের পেছনে শুধু দুটি কারণই থাকতে পারেÑঅতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস অথবা অসহায়ত্ব। তারা আত্মবিশ্বাসী কারণ তারা জানে কীভাবে নির্বাচনে জিততে হয়। আবার তারা অসহায়ও, কারণ এর বাইরে অন্য কোনো পথ তাদের জানা নেই।

বিজেপির ‘বন্দে মাতরম’র রাজনীতি নিয়ে দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো এর মধ্যে নিহিত একটি ইঙ্গিত, যেখানে বোঝানো হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ সম্মিলিতভাবে মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহরু এবং সর্দার প্যাটেলের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। ভারতের ‘জাতীয় সংগীত’ হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’র শুধু দুটি স্তবক গ্রহণ করার আগে স্বাধীনতা সংগ্রামী, নোবেলজয়ী এবং জাতীয় সংগীতের রচয়িতারা মিলে দীর্ঘ ও বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। ১৯৩৭ সালের কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে দুটি স্তবকের গানটির প্রস্তাবই সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছিল।

কিন্তু তাদের দুটি স্তবকের মধ্যে সীমিত রাখার সিদ্ধান্তটি প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে মোদি-শাহ কার্যত এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, গান্ধী, ঠাকুর, বসু, প্যাটেল ও নেহরুর চেয়ে তারাই অধিকতর জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক। স্বাধীনতার পর গণপরিষদ ‘বন্দে মাতরম’র দুটি স্তবককেই আমাদের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করেছিল। অথচ আজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের স্বাক্ষরিত সাধারণ এক আদেশের মাধ্যমেই তা পরিবর্তন করে ছয় স্তবকে উন্নীত করা হলো। এটি ভারতের সংবিধানপ্রণেতাদের অবমাননা করারই শামিল।

‘বিকশিত ভারত’-এর প্রশ্ন

বিজেপির ‘বন্দে মাতরম’ রাজনীতি নিয়ে তৃতীয় সমস্যাটি হলোÑএটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্বারা চালিত বলে মনে হয়। মোদি ২৪ বছর ধরে (প্রথমে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে) প্রতিটি স্বাধীনতা দিবসে আনন্দের সঙ্গেই ওই দুটি স্তবকের গানটি গেয়েছেন। তাহলে ২৬তম বছরে এসে হঠাৎ কী এমন ঘটল? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, যে সরকার ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তারা কি আদৌ এমন কোনো মেরূকরণমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে?

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গত ফেব্রুয়ারি মাসের একটি আদেশে বলা হয়েছে, ‘দেশের সব স্কুলে দিনের কার্যক্রম জাতীয় সংগীত সমবেতভাবে গাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। স্কুল কর্তৃপক্ষকে তাদের কর্মসূচিতে জাতীয় সংগীত গাওয়াকে জনপ্রিয় করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে...।’

আপাতদৃষ্টিতে এটিকে একটি নিরীহ পরামর্শ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বিজেপির কোনো অতি-উৎসাহী মুখ্যমন্ত্রী যদি সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, মাদরাসা, মিশনারি স্কুলÑঅর্থাৎ ‘সব স্কুলে’ ছয় স্তবকের জাতীয় সংগীত গাওয়া বাধ্যতামূলক করে দেন, তখন এটি প্রতিটি গ্রাম, মফস্বল ও শহরে বড় ধরনের সমস্যা বা সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।

দ্য প্রিন্ট অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন