নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, ফিলিস্তিন ও চলমান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করলেও ইরান যুদ্ধ ঘিরে জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১১ সদস্যের এই জোট বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করে। তবে ইরান নিয়ে ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নাম উল্লেখ করে তাদের হামলার নিন্দা করা হয়নি। একইভাবে ইরানের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলারও সরাসরি নিন্দা করা হয়নি। পরিবর্তে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইরান যুদ্ধই এবারের সম্মেলনে ব্রিকসের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল। গত বছর রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে সরাসরি নিন্দা করা হয়েছিল। কিন্তু এবার সদস্যদের মতপার্থক্যের কারণে সেই অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে জোটটি। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—দুই দেশই ব্রিকসের সদস্য হলেও চলমান সংঘাতে তাদের অবস্থান পরস্পরবিরোধী।
তবে ঘোষণায় বেসামরিক অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সুরক্ষার আওতাধীন শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সরাসরি কোনো দেশের নাম না থাকলেও এই বক্তব্যকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরোক্ষ সমালোচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও ব্রিকস কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের নাম নেয়নি। আন্তর্জাতিক বিরোধ সংলাপ, পরামর্শ ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া আরোপ করা একতরফা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে জোটটি। এই অবস্থান রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটি ব্যাপক পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবশ্য ব্রিকস তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। ঘোষণায় ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার বিরোধিতা করা হয়েছে এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক ও জনমিতিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা হয়েছে। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধ, মানবিক সহায়তা অবাধে প্রবেশ, জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর প্রতি সমর্থন এবং জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে ব্রিকস। ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে।
বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়েও ব্রিকসের ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একতরফা শুল্ক ও অশুল্ক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বিশ্ব বাণিজ্যকে বিকৃত করছে বলে উল্লেখ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি নেওয়া হয়নি। ফলে ইরান যুদ্ধের মতো এখানেও সদস্য দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে সাধারণ নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে।
সম্মেলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই—ব্রিকসের অর্থনৈতিক ও জনমিতিক প্রভাব বাড়লেও অভিন্ন ভূরাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা এখনও কঠিন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্রিকসকে ‘কারও বিরুদ্ধে’ জোট হিসেবে না দেখে গ্লোবাল সাউথকে বৈশ্বিক নিয়ম প্রণয়নে আরো সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এবারের সম্মেলন দেখিয়েছে, ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সংলাপের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জোটটি গুরুত্বপূর্ণ; তবে সেই মতপার্থক্য অতিক্রম করে সমন্বিত ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা এখনও সীমিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

