ইরান যুদ্ধ

সার ঘাটতিতে খাদ্য সংকটের শঙ্কায় ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সার ঘাটতিতে খাদ্য সংকটের শঙ্কায় ভারত

ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের বাসিন্দা গুরবিন্দর সিং কখনো ভাবেননি ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ তার এই শহরের শান্ত কোণটিকেও ছুঁয়ে যাবে। ভারতের শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত পাঞ্জাব রাজ্যে তার ছোট খামারটিতে পালাক্রমে গম ও ধান চাষ করেন তিনি। এ দুই শস্য ছাড়া অন্য কোনোকিছুর কথা তিনি ভাবতে পারেন না। হাজার হাজার মাইল দূরে চলমান একটি যুদ্ধ নিয়ে মানসিক অস্থিরতা ও উদ্বেগ তাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। কারণ, তিনি ভয় পাচ্ছেন এ মৌসুমে তার ধানের ফলন নিয়ে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব কেবল জ্বালানি নয়, কৃষিক্ষেত্রেও পড়তে শুরু করেছে। গুরবিন্দর বলেন, ইতোমধ্যেই মুনাফা নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার ওপর যদি সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার না পাই, তাহলে ফলন কম হবে। এর প্রভাব নিজ পরিবারের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলে পড়বে। কারণ, তার মতো এখানকার সবাই পুরোপুরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষি বাঁচাতে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

এক মাসেরও বেশি সময় আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা-ইসরাইল যৌথ হামলা চালায় ইরানের ওপর। পাল্টা জবাব দেয় ইরানও। ইসরাইল ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমেরিকান স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এছাড়া প্রতিশোধ হিসেবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তেহরান। তাদের এমন সিদ্ধান্তে চরম বিপাকে পড়ে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল ও গ্যাস আমদানিকারক দেশগুলো। যার প্রভাব বিশ্বকে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট।

খাদ্য সংকট মোকাবিলায় ২০২৩-২৪ সালে সার ভর্তুকিতে এক দশমিক আট ট্রিলিয়ন রুপির (২২ বিলিয়ন ডলার) বেশি ব্যয় করেছে ভারত, যা দেশটির কৃষকের জন্য এর গুরুত্ব এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যবৃদ্ধির প্রতি কৃষি খাতের সংবেদনশীলতাকে তুলে ধরে। কৃষি অর্থনীতিবিদ দেবিন্দর শর্মা বলেছেন, প্রাথমিক লক্ষণগুলো যুদ্ধের কারণে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং খরচ বৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করছে, যার বোঝা ইতোমধ্যেই কৃষকদের ওপর চাপানো হচ্ছে। ভারতীয় কৃষি এখনো রাসায়নিক সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তিনি বলেন, সরবরাহ ঘাটতি দ্রুত উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

এই সংঘাত ইতোমধ্যেই সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে। কৃষকরা বলছেন, তারা বিশেষ করে ইউরিয়া সার নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সারটি ভারতের কৃষিকাজের কেন্দ্রবিন্দু। এটি ফসলের জন্য প্রধান পুষ্টি উপাদান হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং এর বার্ষিক ব্যবহার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মিলিয়ন টন। যদিও এর বেশিরভাগই দেশে উৎপাদিত হয়; তবে এর উৎপাদন আমদানিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ইতোমধ্যেই দেশে গ্যাস সংকট তৈরি হওয়ায় কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে সরকার।

পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো প্রধান শস্য উৎপাদনকারী রাজ্যের কৃষকরা বলছেন, এর তাৎক্ষণিক প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়; তবে আতঙ্ক বিরাজ করছে। জুন থেকে অক্টোবর ‘খরিফ মৌসুম’ নামে পরিচিত ভারতে। এ মৌসুমের আবাদের জন্য সার সংগ্রহ শুরু হয় মে মাসে। জুন ও জুলাই মাসে ধান ও তুলার মতো ফসল বপনের আগে। ফলে সার ঘাটতি ফসলের ফলনে প্রভাব ফেলবে।

কর্ণাটকের হুব্বাল্লির এক সার বিক্রেতা প্রকাশ লিম্বুইয়া স্বামী বলেন, ভারতে খরিফ মৌসুমে সাধারণত প্রায় ১০০ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদিত হয়। কৃষকরা সাধারণত আগাম ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে সার কেনেন। কিন্তু এই সংকটের মধ্যে অনেকেই তা মজুত করছেন। গত ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি এমন পরিস্থিতি দেখেননি।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, সার কারখানাগুলো স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং গত বছরের তুলনায় বাফার স্টক বেশি রয়েছে। যদিও আগের প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছিল, বেশ কয়েকটি কারখানায় গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অপর্ণা এস শর্মা বলেছেন, বর্তমানে গত বছরের তুলনায় বেশি সার মজুত রয়েছে, যা একটি ভালো ব্যবস্থা।

কিন্তু এই আশ্বাস সত্ত্বেও কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাটছে না। ভারতে অনেক ক্ষুদ্র কৃষক ইতোমধ্যেই ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন এবং ঋণের ভারে জর্জরিত। যদিও তাদের যথেষ্ট রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার।

শ্রীলঙ্কায় ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সার ঘাটতির আশঙ্কা বিশেষভাবে ভয়াবহ বলে প্রমাণিত হয়েছে। পাঁচ বছরেরও কম সময় আগে দেশটির কৃষক একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। সেই অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শ্রীলঙ্কা আমদানি করা সার কিনতে অক্ষম হয়ে পড়েছিল, যার প্রভাব পড়ে কৃষি খাতে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুসারে উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং সার সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে থাকলে সুদানের পর শ্রীলঙ্কাকে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন