ভারতে ‘ভোটব্যাংক’ ও ‘ভোট কাটুয়া’ তকমার ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক

ভারতে ‘ভোটব্যাংক’ ও ‘ভোট কাটুয়া’ তকমার ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক

ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘ভোটব্যাংক’ ও ‘ভোট কাটুয়া’—এই দুটি শব্দ বহুল প্রচলিত। তবে মুসলিম রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মুসলিম প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ‘ভোট কাটুয়া’ তকমার ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। অথচ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিরোধী শিবিরের ভোট ভাগ করে দিতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে একইভাবে এই তকমা ব্যবহার করা হয় না। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুসলিম পলিটিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার সভাপতি ড. তাসলিম আহমদ রেহমানি।

ভারতে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মুসলিম রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অংশগ্রহণকে বিরোধী ভোট ভাগ করার জন্য দায়ী করা হলেও এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নির্বাচনী তথ্য-প্রমাণ থাকা জরুরি। কোনো প্রার্থীর অংশগ্রহণে ভোট ভাগ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের ক্ষতি হয়েছে—এমন দাবি যাচাই করতে হলে সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

‘ভোটব্যাংক’ রাজনীতি শুধু মুসলিমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়

‘ভোটব্যাংক’ ধারণাটি বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় পরিচিতি পায়। নৃবিজ্ঞানী এম এন শ্রীনিবাস তার অ্যা ভিলেজ ইন মাইসোর গ্রন্থে শব্দটি ব্যবহার করেন। পরে এফ জি বেইলি তার পলিটিকস অ্যান্ড সোশ্যাল চেঞ্জ (১৯৫৯) গ্রন্থে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, সামাজিক কাঠামো ও নির্বাচনী প্রভাবের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন।

ভারতের রাজনীতিতে ধর্ম, জাতপাত, ভাষা, জাতিগত পরিচয় ও আঞ্চলিক আনুগত্যের ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় মুসলিম ও হিন্দু অনগ্রসর শ্রেণির বড় একটি অংশকে কংগ্রেসের ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক ও জাতপাতভিত্তিক দলগুলোর উত্থানে এই সমীকরণ বদলে যায়। বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম ভোটারদের বড় অংশ ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা দলগুলোকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণির ভোটারদের সমর্থন পেতে গড়ে ওঠে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন। উচ্চবর্ণের হিন্দু ভোটারদের বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ ভোটভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ভারতের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই কোনো না কোনো সামাজিক গোষ্ঠীর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। তাই ভোটব্যাংকের রাজনীতি শুধু মুসলিম বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশটির নির্বাচনী রাজনীতির একটি বিস্তৃত বৈশিষ্ট্য।

বিজেপির সাবেক সভাপতি লালকৃষ্ণ আদভানি লিবারহান কমিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। রামমন্দির আন্দোলন বিজেপির পক্ষে বড় একটি হিন্দু ভোটভিত্তি গড়ে তোলার হাতিয়ার ছিল। এটি দেখায়, ভারতে নির্বাচনী সমর্থন আদায়ে ধর্মীয় পরিচয়, জাতপাত, ভাষা ও আঞ্চলিক আনুগত্য কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

‘ভোট কাটুয়া’ তকমা নিয়ে আপত্তি

‘ভোট কাটুয়া’ বলতে সাধারণত এমন কোনো দল বা প্রার্থীকে বোঝানো হয়, যার নির্বাচনে অংশগ্রহণের ফলে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোট ভাগ হয়ে যায় এবং পরোক্ষভাবে অন্য কোনো দল সুবিধা পায়। এ শব্দটি প্রায়ই নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়, সংশ্লিষ্ট প্রার্থী নিজে জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা না থাকলেও অন্য প্রার্থীর পরাজয়ে ভূমিকা রাখছেন।

মুসলিম রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মুসলিম প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এ তকমা বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বলা হয়, তারা বিজেপিবিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর ভোট ভাগ করে বিজেপিকে সুবিধা করে দেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে মুসলিম ভোটারদের বড় অংশ সাধারণত নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচয় দেওয়া দলগুলোকে সমর্থন করেছেন।

মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দকে শুধু মুসলিম দলগুলোর প্রতি সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে বিজেপিকে পরাজিত করা এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রাখার লক্ষ্য থেকেই তারা বিভিন্ন দলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ফলে বিরোধী ভোট ভাগ হওয়ার জন্য মুসলিম প্রার্থী ও দলগুলোকে দায়ী করার আগে আরো কঠোরভাবে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

কোনো নির্বাচনে একটি সামাজিক গোষ্ঠীর ভোট বিভিন্ন প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। স্থানীয় বিরোধ, প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ, প্রতিষ্ঠিত দলের প্রতি অনাস্থা কিংবা বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের উত্থানের কারণে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভোটও ভাগ হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের ঘটনা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

মুসলিম ভোটের রাজনৈতিক সমীকরণ

১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থা পর্যন্ত মুসলিম ভোটারদের কংগ্রেসের নির্ভরযোগ্য ভোটভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরে জনতা পার্টির উত্থানের সময় মুসলিম ভোটের একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক জোটের দিকে যায়। জনতা পার্টির ভাঙন এবং জনতা দলসহ বিভিন্ন উপদলের উত্থান ভারতের রাজনৈতিক সমীকরণ আরো বদলে দেয়।

পরবর্তী দশকগুলোতে উত্তর ভারতের মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশ সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, তৃণমূল কংগ্রেস, বামপন্থী জোট ও কংগ্রেসকে সমর্থন করেন। দক্ষিণ ভারতে কংগ্রেস এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দল ও জোট মুসলিম ভোটারদের সমর্থন পেয়েছে। বিজেপির অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার আশায় মুসলিম ভোটাররা এসব দলকে সমর্থন দিয়েছেন।

১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ কেরালায় দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী প্রভাব ধরে রেখেছে। তবে দলটি দেশজুড়ে একই ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) এবং আসামের অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টও (এআইইউডিএফ) নিজ নিজ অঞ্চলের বাইরে উল্লেখযোগ্য প্রভাব গড়ে তুলতে পারেনি।

আবদুল জলিল ফরিদির জোট রাজনীতির উদাহরণ

উত্তর প্রদেশের রাজনীতিতে ড. আবদুল জলিল ফরিদির ভূমিকা রয়েছে। ১৯৬৮ সালের শেষ দিকে ফরিদি চৌধুরী চরণ সিংয়ের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এর লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটের আওতায় আনা।

১৯৭০ সালের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে মুসলিম মজলিসের সঙ্গে জোট করে চরণ সিং সরকার গঠন করতে সক্ষম হন। ফরিদির এই উদ্যোগ উত্তর ভারতে জোট রাজনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসের মতো প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর রাজনৈতিক কৌশল এ ধরনের বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের পরিসর সংকুচিত করে।

ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থে মুসলিমরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সরকারে অংশগ্রহণ এবং নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের সুযোগের সঙ্গে আপস করেছেন। তারপরও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা দলগুলোর পরাজয়ের জন্য মুসলিম দল ও প্রার্থীদের দায়ী করা হয়।

মুসলিম ভোটাররা যদি ধারাবাহিকভাবে বিজেপিবিরোধী দলগুলোকে সমর্থন করে থাকেন, তাহলে ওই দলগুলো কেন বারবার বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপিকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে?

অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড কোথায়?

মুসলিম দলগুলোকে ‘ভোট কাটুয়া’ বলার ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়, তা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা উচিত। অনেক আঞ্চলিক, জাতপাতভিত্তিক ও পরিবারকেন্দ্রিক দল নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু তারাও নিজেদের মূল প্রভাববলয়ের বাইরে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং কখনো কখনো বিজেপিবিরোধী ভোট ভাগ করে দেয়। তা সত্ত্বেও তাদের একই মাত্রায় ‘ভোট কাটুয়া’ বলা হয় না।

উত্তর প্রদেশে বহুজন সমাজ পার্টির ঐতিহাসিক ভিত্তি থাকলেও তারা দেশজুড়ে লোকসভা ও বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। জাতীয় পর্যায়ে তাদের ভোটের হার কম এবং সাম্প্রতিক দুটি লোকসভা নির্বাচনে দলটি কোনো আসন পায়নি। অনেক এলাকায় দলটির সীমিত ভোটও প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে ভোট ভাগ করে বিজেপিকে সুবিধা দিতে পারে।

সমাজবাদী পার্টির প্রভাব প্রধানত উত্তর প্রদেশে কেন্দ্রীভূত হলেও দলটি অন্য রাজ্যেও নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। আম আদমি পার্টি দিল্লি ও পাঞ্জাবে শক্তিশালী হলেও হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, গুজরাট ও গোয়ার মতো রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। এসব রাজ্যে দুই দলের মধ্যে ভোটের লড়াই কংগ্রেসের নির্বাচনী ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং বিজেপিকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছে। ২০২৫ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনেও কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বিজেপি লাভবান হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে আসাম, ত্রিপুরা ও গোয়ার মতো রাজ্যে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় জনতা দল, জনতা দল (ইউনাইটেড) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দলও নিজেদের মূল প্রভাববলয়ের বাইরে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এসব দলের অংশগ্রহণে ভোট ভাগ হলেও কেন তাদের সাধারণভাবে ‘ভোট কাটুয়া’ বলা হয় না?

মহারাষ্ট্রের বঞ্চিত বহুজন আঘাড়ির উদাহরণও দেয়া যায়। প্রকাশ আম্বেদকরের নেতৃত্বাধীন দলটি অন্তত ৪০টি আসনে এমনভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, যা বিভিন্ন দলের মধ্যে ভোটের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলেছিল। তার মতে, এর ফলে বিজেপি নেতৃত্বাধীন মহাযুতি জোট সরকার গঠনের সুবিধা পায়।

দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিজেপিও প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক দল ও জোটের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং কখনো কখনো ভোটের বণ্টনে প্রভাব ফেলে। কিন্তু এসব পরিস্থিতিতে ‘ভোট কাটুয়া’ শব্দটি একইভাবে ব্যবহার করা হয় না। এই বৈষম্য মুসলিমদের নির্বাচনী অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করার প্রবণতা তুলে ধরে।

তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিতর্কের আহ্বান

মুসলিম রাজনৈতিক দলগুলোকে ঘিরে ‘ভোট কাটুয়া’ বিতর্কের অবসানে রাজ্যভিত্তিক ও আসনভিত্তিক বিশদ গবেষণার প্রয়োজন। নির্বাচনে মুসলিম দলগুলোর অংশগ্রহণ কীভাবে ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে, তা নিরপেক্ষ তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা উচিত।

মুসলিম সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। মুসলিমরা নির্বাচনে অংশ নিলেই ধর্মনিরপেক্ষ ভোট ভাগ হয়ে যায় কিংবা মুসলিম রাজনৈতিক দলগুলো স্বভাবতই ‘ভোট কাটুয়া’—এমন সাধারণীকরণ গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বারবার একই অভিযোগ তুলে ধরার বদলে তার সত্যতা প্রমাণ করতে হবে।

মুসলিমদের নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকারের মতোই গণতান্ত্রিক অধিকার। ভোট ভাগ হওয়ার অভিযোগ তুলে মুসলিমদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করা হলে বৃহত্তর দলগুলোর ওপর তাদের নির্ভরতা বাড়বে। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুসলিমদের নাগরিক অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিক্ষা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং উপাসনালয়ের সুরক্ষার মতো বিষয়ে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে।

মুসলিমদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোও নিজেদের সঙ্গে স্বাধীনভাবে দর-কষাকষি করতে সক্ষম এমন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নিয়ে শঙ্কিত। তবে সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রতিষ্ঠিত দলগুলো যথাযথভাবে ধারণ করছে কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন রাজনৈতিক জোটের সম্ভাবনা

ড. ফরিদির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে জোট গঠনের পক্ষে ছিলেন। তিনি নিজের দলের নাম অল ইন্ডিয়া মুসলিম মজলিস রাখতে দ্বিধা করেননি। সমসাময়িক মুসলিম রাজনীতিকেরা ফরিদির অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবদান থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।

তামিলনাড়ুর ইভি রামাসামি পেরিয়ার থেকে উত্তর প্রদেশের চৌধুরী চরণ সিং পর্যন্ত বিভিন্ন নেতা ফরিদির রাজনৈতিক দক্ষতা ও তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। দলিত নেতা কাংশি রামও তাকে রাজনৈতিক শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করতেন।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী, দলিত ও অন্যান্য অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এমন উদ্যোগ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির বাইরে একটি তৃতীয় রাজনৈতিক ধারা তৈরির ভিত্তি হতে পারে। তবে এর সাফল্যের জন্য শুধু সামাজিক বঞ্চনার অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি, শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো, গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব এবং প্রতিনিধিত্ব নিয়ে পারস্পরিক সমঝোতা।

এমন কোনো উদ্যোগ গড়ে না উঠলে ভারতের রাজনীতি ক্রমেই হিন্দুত্বের প্রকাশ্য ও তুলনামূলক নমনীয়—এই দুই ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। এতে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ভূমিকা আরো সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

‘ভোটব্যাংক’ ও ‘ভোট কাটুয়া’ নিয়ে বিতর্ক শুধু নির্বাচনী পরিভাষার বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সংখ্যালঘুদের স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং ক্ষমতার বণ্টনের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো দলকে ভোট ভাগ করার জন্য দায়ী করার আগে স্বচ্ছ নির্বাচনী তথ্য দিয়ে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সব দলের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।

বি.দ্র: ক্ল্যারিয়ন ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত ড. তাসলিম আহমদ রেহমানির লেখা ‘ভোট ব্যাংক, ভোট-কাটওয়া অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব মুসলিম রিপ্রেজেন্টেশন ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক নিবন্ধের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি। এতে উল্লিখিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতামত লেখকের নিজস্ব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...