ভারতের উত্তর প্রদেশের রামপুরে জুলাইয়ের তীব্র গরম উপেক্ষা করে জাতীয় পতাকা হাতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শত শত মানুষ। তাদের দাবি একটাই—মোহাম্মদ আলি জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮টি ভবন ভেঙে ফেলার আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে নতুন দিল্লিতে যুব আন্দোলনকারীদের চাপে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলেও রামপুরের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাঁচাতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এর বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী মোহাম্মদ আলি জওহরের নামে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় উত্তর প্রদেশের বিশিষ্ট মুসলিম রাজনীতিক ও সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আজম খানের আজীবন প্রচেষ্টার ফল।
গত ১৫ জুলাই রামপুর জেলা প্রশাসন নির্দেশনা জারি করে যে, ২৫০ একর জুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টিই ‘অবৈধ’ এবং আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তা নিজ খরচে ভেঙে ফেলতে হবে। নির্ধারিত সময়ে না ভাঙলে সরকারি বুলডোজার দিয়ে ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
যদিও সম্প্রতি রাজ্য প্রশাসন রামপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (আরডিএ) আদেশের ওপর একটি অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, এতে শঙ্কা কাটেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরউদ্দিন জানান, এই স্থগিতাদেশ কেবল সাময়িক সময় বাড়িয়েছে, কিন্তু আদেশটি সম্পূর্ণ বাতিল হয়নি।
‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’ নাকি আইনি প্রক্রিয়া?
প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীর এই ক্যাম্পাসে রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে 'প্রতিহিংসার রাজনীতি' হিসেবে দেখছেন বিরোধী রাজনীতিকরা। সমাজবাদী পার্টির আইনপ্রণেতা জাভেদ আলি খান অভিযোগ করেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা আজম খান এবং এর ভিত্তিপ্রস্তর ও উদ্বোধনের সঙ্গে সমাজবাদী পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব যুক্ত ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, এটি একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়। মূলত অশিক্ষিত সমাজ গড়া এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই বিজেপি সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
অন্যদিকে বিজেপির রাজ্য মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আজম খান নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ জমিতে এবং নকশা বহির্ভূতভাবে এসব ভবন নির্মাণ করেছিলেন। এটি কেবল অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে একটি স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া।’
তবে উপাচার্য জহিরউদ্দিন পাল্টা যুক্তি দিয়ে জানান, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রামপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (আরডিএ) আওতাভুক্ত হয় এই অঞ্চল। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় ও এর ভবনগুলো নির্মিত হয়েছিল তার বহু বছর আগে। ফলে নির্মাণের সময়ে আরডিএর অনুমোদন নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না।
বিপাকে নারী ও অমুসলিম শিক্ষার্থীরা
উত্তর প্রদেশের অন্যতম শিক্ষা-অনগ্রসর জেলা রামপুরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের বড় অংশই নারী। প্রক্টর গুলরেজ নিজামী জানান, মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকই ছাত্রী।
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইক্রা বলেন, ‘নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের কারণেই আমাদের অভিভাবকেরা এখানে পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে দেওয়া হলে আমার মতো অনেক মুসলিম মেয়ের শিক্ষাজীবন সেখানেই শেষ হয়ে যাবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়টি কেবল মুসলিম শিক্ষার্থীদেরই নয়, মোট শিক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের। প্যারামেডিক্যালের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী চাঁদনি দিবাকর বলেন, ‘আইনি মর্যাদার দিক থেকে এটি সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান হতে পারে, কিন্তু এখানে কোনো বৈষম্য নেই। এক বছরের পড়াশোনায় এক মুহূর্তের জন্যও নিজেকে অমুসলিম মনে হয়নি।’
বুলডোজার সংস্কৃতি ও দমননীতির ছায়া
মানবাধিকার কর্মী ও শিক্ষাবিদদের মতে, ২০১৭ সালে যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে মুসলিম মালিকানাধীন বা পরিচালিত নানা স্থাপনার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ও বুলডোজার অভিযান ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অপূর্বানন্দ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘বিষয়টি তিনটি দিক থেকে দেখা যায়।
১/ হিন্দু ভোটারদের সামনে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব দমন করার মানসিকতা।
২/ সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের ধারাবাহিক প্রচার।
৩/ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক হিন্দু ও মুসলিমদের সামাজিক মেলবন্ধন বিনষ্ট করা।
বর্তমানে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে গেলেও তাদের পরিবারকে পুলিশের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট বার্তা—ক্যাম্পাস বাঁচাতে তারা শেষ পর্যন্ত আইনি ও সামাজিক লড়াই চালিয়ে যাবেন।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

