বঙ্গভবনের দায়িত্ব ছাড়লেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবলয় ছাড়ছেন না সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। গত শুক্রবার তার পদত্যাগের পর রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবনে ওঠার আগেই সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একই সঙ্গে বিধান অনুযায়ী সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আজীবন পেনশনসহ একাধিক সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়লেও রাষ্ট্রের প্রটোকল ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো বহাল থাকছে।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (প্রটেকশন) নাসিরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আইন অনুযায়ী সাবেক রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় যা যা করা দরকার, সেসব করা হচ্ছে। নিরাপত্তার বিষয়টি সমন্বয় করবে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গুলশান-২-এর ১২৩ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর ‘গ্রিন ভিলা’ ভবনের পঞ্চমতলার নিজস্ব ফ্ল্যাটেই অবস্থান করবেন সাহাবুদ্দিন। বাসভবনকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিকল্পনা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ভবনের প্রবেশপথে পুলিশ মোতায়েন, আশপাশে সাদা পোশাকের সদস্যদের নজরদারি, প্রয়োজনীয় যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা বাড়ানো বা কমানোর সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আজ রোববার গুলশানের বাসাটিতে ওঠার কথা রয়েছে চুপ্পুর।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পেনশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অন্তত ছয় মাস রাষ্ট্রপতির পদে দায়িত্ব পালন শেষে পদত্যাগ করলেও তিনি আজীবন নির্দিষ্ট কিছু সরকারি ও প্রটোকল সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবেন। ২০২৩ সালে আওয়ামী সরকারের আমলে দায়িত্ব নেওয়া সাহাবুদ্দিন চুপ্পুও এ আইনি সুযোগ-সুবিধার আওতায় এসেছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা চালু থাকছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑনিরাপত্তা ও প্রটোকল ব্যবস্থা, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধা, ভ্রমণ ও অবস্থান সুবিধা, আজীবন পেনশন ও ভাতা ইত্যাদি।
বর্তমান আইনে পেনশনের পরিমাণ রাষ্ট্রপতি হিসেবে সর্বশেষ প্রাপ্ত বেতনের ৭৫ শতাংশ। চাইলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি মাসিক পেনশনের পরিবর্তে এককালীন গ্র্যাচুইটিও গ্রহণ করতে পারেন। আইন অনুযায়ী, তিনি যদি আগে থেকেই অন্য কোনো সরকারি পেনশন পান, তাহলে দুটি পেনশন একসঙ্গে গ্রহণ করতে পারবেন না, একটি বেছে নিতে হবে। এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর পর তার স্ত্রী নির্ধারিত হারে পারিবারিক পেনশন পাওয়ার বিধানও রয়েছে।
এছাড়া একটি কূটনৈতিক (ডিপ্লোম্যাটিক) পাসপোর্ট, ব্যক্তিগত সহকারী, একজন পরিচারক, সরকারি কাজে ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত বার্ষিক ভাতা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রাখেন। এসব সুবিধা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন-পরবর্তী মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম বিবেচনায় দেওয়া হয়।
সাবেক রাষ্ট্রপতিকে কত বছর বা কত দিন সরকারি নিরাপত্তা দেওয়া হবেÑএমন নির্দিষ্ট সময়সীমা বাংলাদেশের কোনো আইনে উল্লেখ নেই। নিরাপত্তার বিষয়টি নির্ভর করে সরকারের নিরাপত্তা মূল্যায়ন, গোয়েন্দা সংস্থার সুপারিশ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর। অর্থাৎ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তার ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
অবশ্য আইনে স্পষ্ট বলা আছে, ভবিষ্যতে যদি কোনো সাবেক রাষ্ট্রপতি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধে দণ্ডিত হন অথবা অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের অপরাধে অভিযুক্ত হন, তবে এসব সরকারি সুবিধা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে যাবে। নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিজে থেকে পদত্যাগ করার কারণে রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী গুলশানের নিজস্ব বাসায় এখন প্রটোকল সুবিধাসহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা পাবেন মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দোসর এ সাবেক রাষ্ট্রপতি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর গুলশানের বাসায় নিরাপত্তায় যথাযথ ব্যবস্থা দেওয়ার প্রস্তুতি গত শনিবারই শেষ করেছে তারা। বাসার চারদিকের নিরাপত্তায় পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। ইতোমধ্যে বাসার টেলিফোন লাইন সংযোগ করা হয়েছে। বাসায় যাতায়াতের পথে এবং আশপাশের সড়কে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
গুলশানের বাসাটি চুপ্পুর নিজের মালিকানাধীন বলে জানা গেছে। বাসার আশপাশের সড়কগুলোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নিয়মতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন আজ থেকে। নিয়মিত ওই এলাকায় পুলিশের টহল টিম দায়িত্ব পালন করবে। গুলশান থানা পুলিশ বিশেষ নজর রাখবে গ্রিন ভিলার দিকে। র্যাবের টিমও মাঝেমধ্যে টহল দেবে। চুপ্পুর বাসায় কারা যাতায়াত করছেÑএগুলো মনিটরিং করা হবে বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে সবার গতিবিধি নজরদারি করা হবে। নজরদারির বাইরে থাকছেন না চুপ্পুও।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনকারী গোষ্ঠী তার পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিল। এর মধ্যেই গত শুক্রবার তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতির দপ্তর জানিয়েছে, গুরুতর স্নায়বিক জটিলতার কারণে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছিল। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



