ভারতে আশঙ্কাজনকভাবে কমছে জন্মহার

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ভারতে আশঙ্কাজনকভাবে কমছে জন্মহার

ভারতে দ্রুত কমে যাচ্ছে সন্তান জন্মহার। শিক্ষা, ক্যারিয়ার সচেতনতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতার কারণে দেশটির তরুণ প্রজন্ম আগের তুলনায় কম সন্তান নিচ্ছে, এমনকি অনেক দম্পতি সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

ভারতের সর্বশেষ স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসআরএস) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশটির মোট প্রজনন হার (টিএফআর) নেমে এসেছে প্রতি নারীতে ১ দশমিক ৯ সন্তানে। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় হার ২ দশমিক ১ হলেও বর্তমানে তা এর নিচে অবস্থান করছে। দুই দশক আগে ভারতে এই হার ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩।

ভারতের প্রযুক্তিনগরী বেঙ্গালুরের জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী ৪১ বছর বয়সী নিধি আগারওয়াল ও তার স্বামী বিয়ের পরই সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের মতে, সন্তান লালন-পালনের পরিবর্তে নিজেদের ক্যারিয়ার ও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাখতে সক্ষম উদ্যোগ গড়ে তোলাই তাদের অগ্রাধিকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চশিক্ষা ও বিশ্বায়নের প্রভাবে বর্তমান প্রজন্মের নারীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। বেঙ্গালুরের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ জ্যোৎস্না মিরলে জানান, একসময় সমাজে প্রচলিত ছিল বিয়ে ও সন্তান ছাড়া জীবন পূর্ণতা পায় না। তবে এখন শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নারীরা সেই ধারণা থেকে সরে আসছেন।

তার ভাষ্য, বর্তমানে অনেক দম্পতি সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ক্যারিয়ারের সঙ্গে সমন্বয় করে বিবেচনা করেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সন্তান তাদের জীবনে প্রকৃতপক্ষে কী মূল্য যোগ করবে, নাকি এটি শুধু সামাজিক প্রত্যাশা পূরণের বিষয়।

ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়ার আরেকটি প্রবণতা হলো ডিম্বাণু সংরক্ষণ বা ‘এগ ফ্রিজিং’। ভারতে বর্তমানে দুই হাজারের বেশি ফার্টিলিটি সেন্টার এই সুবিধা দিচ্ছে। ফলে নারীরা উপযুক্ত সময় ও আর্থিক সক্ষমতা অর্জনের পর মাতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

তবে শুধু ক্যারিয়ার নয়, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির গড় বার্ষিক আয় ছিল ২ হাজার ৮৭৮ মার্কিন ডলার। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

একটি বহুজাতিক ইলেকট্রনিকস প্রতিষ্ঠানের কর্মী রূপা বলেন, অধিকাংশ মানুষ সন্তানকে উন্নত শিক্ষা ও ভালো ভবিষ্যৎ দিতে চান। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় অনেকেই পরিবার বড় করার আগে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চাইছেন।

মানবাধিকার আইনজীবী শ্বেতা লুথ্রার মতে, অনেক তরুণ-তরুণী এখন সন্তান পালনের পরিবর্তে নিজেদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করতে আগ্রহী। ভ্রমণ, বিনোদন ও ব্যক্তিগত জীবনযাপনে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিকে ভারতে শিশু মৃত্যুর হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৯ সালে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে যেখানে ৩০ শিশুর মৃত্যু হতো, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৪-এ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু মৃত্যুহার কমে গেলে পরিবারগুলো সাধারণত কম সন্তান নেওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিহার ও উত্তর প্রদেশের মতো অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এবং কম শিক্ষিত রাজ্যগুলোতে এখনও প্রজনন হার বেশি। বিহারে এই হার ২ দশমিক ৯ এবং উত্তর প্রদেশে ২ দশমিক ৬। বিপরীতে, উচ্চশিক্ষা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবাসমৃদ্ধ দিল্লিতে এই হার মাত্র ১ দশমিক ২। দক্ষিণের তামিলনাড়ু ও কেরালায় তা ১ দশমিক ৩।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, গর্ভনিরোধক সহজলভ্য হওয়ায় নারী ও দম্পতিরা এখন সন্তান নেওয়ার বিষয়ে আরও সচেতন ও পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। পাশাপাশি পরিবার ও কর্মক্ষেত্র থেকে পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবও সন্তান নেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে বন্ধ্যাত্বের হারও বেড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে ১৯৯২-৯৩ সালে বন্ধ্যাত্বের হার ছিল ২২ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০১৫-১৬ সালে বেড়ে ৩০ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থূলতা, হরমোনজনিত সমস্যা ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এর অন্যতম কারণ।

সন্তান জন্মহার কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে কিছু রাজ্য ইতোমধ্যে প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করেছে। অন্ধ্র প্রদেশ তৃতীয় সন্তান জন্মে ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তান জন্মে ৪০ হাজার রুপি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায় সরকারি অর্থায়নে আইভিএফ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেশি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কেন তরুণ দম্পতিরা সন্তান নিতে অনাগ্রহী কিংবা কেন অনেকের গর্ভধারণে সমস্যা হচ্ছে সেসব কারণ খুঁজে বের করে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়াই হবে অধিক কার্যকর।

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই। সন্তান নেওয়া বা না নেওয়া উভয়ই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং সেটিকে সম্মান করা উচিত বলে মত দিয়েছেন ভারতের নতুন প্রজন্মের অনেক নাগরিক।

সূত্র: আল জাজিরা

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন