মক্কা চুক্তি, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও বাংলাদেশ

মক্কা চুক্তি, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও বাংলাদেশ

মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব। গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই ‘মক্কা প্যাক্ট’ মুসলিম বিশ্বে একদিকে যেমন নতুন আশার সঞ্চার করেছে, অন্যদিকে এ নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

প্রতিরক্ষা জোটটির দরজা অন্যদের জন্যও খোলা রয়েছে। সৌদি আরবের পর দ্বিতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ আরব শক্তি হিসেবে মিসরের এই জোটে যোগ দেওয়া যথার্থ হবে বলে মত দিয়েছে তুরস্ক । এ বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে মিসর ও সৌদি আরবের মন্ত্রীদের মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, মিসরের সঙ্গে ইসরাইলের সহযোগী সংযুক্ত আরব আমিরাতের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। মিসর এই প্যাক্টে দ্রুত যোগ দেবে বলে যে ধারণা করা হচ্ছিল, বাস্তবে হয়তো তা তত দ্রুত ঘটবে না; কারণ মিসরের রাজনীতিতে আমিরাতের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব যখন মক্কা প্যাক্ট ঘোষণা করল, তখন মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ইতিবাচক সাড়া দেওয়া দেশগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ। বর্তমান তরুণদের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাস হয়তো খুব বেশি পরিচিত নয়। কিন্তু আমরা যখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন ভূগোলের বইয়ে পাকিস্তানকে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান—এই দুই অংশ নিয়ে গঠিত একটি রাষ্ট্র হিসেবে পড়েছি। আমাদের শৈশব ও স্কুলজীবনে পাকিস্তান ছিল একই রাষ্ট্রের দুটি পৃথক ভূখণ্ড। ১৯৭১ সালের আগে ‘বাংলাদেশ’ নামে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। একদিকে পশ্চিম পাকিস্তান, অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান—আর মাঝখানে ছিল ভারত। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে একটি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটে। আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম—ভাই কি ভাইকে এভাবে হত্যা করতে পারে! এরপর একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। তার নাম হয় বাংলাদেশ।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—দুটি দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং উভয় রাষ্ট্রই ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাদের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এদিকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। এই কারণে ভারত—যে পাকিস্তানের সঙ্গে কাশ্মীর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতে রয়েছে—বাংলাদেশকেও নিজের জন্য আরেকটি সমস্যা হিসেবে দেখতে চায়নি। তাই বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আর দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সহযোগিতার পরিবর্তে ভারতের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে অসম সহযোগিতাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। অবশ্য এই পরিস্থিতিও একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তই স্থায়ী হয়েছে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস , ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় ভারতের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ শাসন করেছেন। একজন কর্তৃত্ববাদী নারী রাজনীতিক হিসেবে শেষ পর্যন্ত জেড জেনারেশনের তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মুখে তার শাসনের পতন ঘটে। দেশজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। কারণ তিনি এমন একজন বাংলাদেশি নেতা ছিলেন, যাকে ভারত দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন ও সুরক্ষা দিয়ে এসেছে।

কিন্তু এখনকার বাংলাদেশ আর আগের সেই বাংলাদেশ নয়। মূল বিষয়টি এখানেই। শেখ হাসিনার আমলে যে বাংলাদেশকে প্রায় ‘চাবিসহ ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে’ বলে মনে করা হতো, তার জায়গায় এখন আমরা এমন এক বাংলাদেশকে দেখতে পাচ্ছি, যে প্রথমবারের মতো নতুন জোটগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, নিজের ভূরাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করছে এবং এই নতুন অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়াকে একটি সূচনা ও নতুন যাত্রার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখছে।

এর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।কারণ অতীতে যেমন ভারত পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মাঝখানে অবস্থান করত, এখন আবার যেন একদিকে পাকিস্তান এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের মধ্যবর্তী এক নতুন ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তাই এই মুহূর্তে নয়াদিল্লি প্রবল অস্বস্তিতে রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনশক্তি, অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সৌদি আরবের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে সৌদি আরবের গভীর ধর্মীয় গুরুত্বও রয়েছে।

তুরস্ক বাংলাদেশের সামনে আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আঙ্কারা এখন ড্রোন, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।

আর রয়েছে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান। শেখ হাসিনার শাসন আমলে ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক অনেকাংশে স্থবির হয়ে ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনার পতনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত উষ্ণ হয়েছে। বাণিজ্য, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সামরিক পর্যায়ের যোগাযোগও সম্প্রসারিত হয়েছে।

তাহলে বিষয়টি আমরা বুঝতে পারছি—

ভারতের দৃষ্টিতে মক্কা প্যাক্ট এখন আর নিছক একটি স্বতন্ত্র চুক্তি নয়। এই চুক্তি এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন গত দুই বছরে বাংলাদেশে ভারতের প্রায় সব স্বার্থ ও স্বস্তিদায়ক অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গেছে। ভারত এমনিতেই দুই বছর ধরে উদ্বিগ্ন ছিল। আর এখন তার সামনে উদ্বেগের আরও বড় কারণ এসে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকায় শেখ হাসিনা ছিলেন ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার। তার ক্ষমতাচ্যুতি শুধু একটি সরকারের পরিবর্তন ঘটায়নি; বরং বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের দীর্ঘদিনের নীতির একটি প্রধান স্তম্ভকেই সরিয়ে দিয়েছে।

ভুরাজনিতিক গবেষকদের মূল্যায়নে, এটি একই সঙ্গে ইসরাইল–ভারত কৌশলগত সমীকরণের জন্যও একটি বড় আঘাত। একটি মুসলিম দেশকে নিজের প্রভাবের মধ্যে রাখতে পারা সবসময়ই একটি বড় কৌশলগত সুবিধা দেয়। এখন সেই ভারতঘেঁষা সরকার চলে গেছে; আর তার জায়গায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

ভারত ও ইসরাইলের দৃষ্টিতে এটি এক দুঃস্বপ্নের মতো পরিস্থিতি। আর পাকিস্তান আবার কূটনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয়ভাবে ফিরে এসেছে। তুরস্কও আরও সুস্পষ্ট ভূমিকা পালন করছে।

একই সঙ্গে চীন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে চীন বাংলাদেশে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। চীন বাংলাদেশকে যুদ্ধবিমানসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে এবং দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখন এর সঙ্গে তুরস্কও আরও সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এই নতুন ভূরাজনৈতিক বিন্যাস ভারত, ইসরাইল এবং অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক কৌশলগত অক্ষের জন্য একটি বড়ো ধরনের ভূকম্পনের মতো পরিবর্তন।

বাস্তবিকই তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার জন্য বাংলাদেশের সামনে অনেক কারন রয়েছে। নিঃসন্দেহে এখানে বাংলাদেশের অনেক স্বার্থও রয়েছে। এসব প্রত্যাশার সবকিছু হয়তো বাস্তবায়িত হবে না। কিন্তু শুধু মক্কা প্যাক্টে সদস্য হওয়াটাই বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ভূরাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। খুব শিগগিরই এমনটি ঘটলে তা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

মূল: আরদান জেনতুর্ক (তুর্কী সাংবাদিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ)

অনুলিখন: সালাহউদ্দীন সাঈদী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন