দিল্লির অনুরোধ উপেক্ষা, মুদ্রায় সেই মানচিত্রই রাখল নেপাল

দিল্লির অনুরোধ উপেক্ষা, মুদ্রায় সেই মানচিত্রই রাখল নেপাল

ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘বৃহত্তর নেপাল’ মানচিত্র নতুন এক রুপির মুদ্রা থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে নেপাল সরকার। বিরোধী দল ও জনমতের চাপে বৃহত্তর নেপালের মানচিত্র বহাল রাখার সিদ্ধান্তে নয়াদিল্লির কূটনীতি কার্যত ধাক্কা খেল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিজ্ঞাপন

নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংক (এনআরবি) শনিবার জানিয়েছে, নতুন এক রুপির মুদ্রা বাজারে ছাড়া হবে। তবে মুদ্রার আকার ও ধাতব উপাদানে পরিবর্তন এলেও তাতে আগের মতোই থাকবে বৃহত্তর নেপালের রাজনৈতিক মানচিত্র, যেখানে ভারতের দাবি করা লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি অঞ্চলকে নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এনআরবির মুখপাত্র গুরু প্রসাদ পাউডেল বলেন, নতুন নকশা আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে না এলেও ব্যাংক নিশ্চিত যে আগের মানচিত্রই বহাল থাকবে। তিনি জানান, নতুন মুদ্রাটি আগের তুলনায় আকারে ছোট ও ওজনে হালকা হবে।

কেন বিতর্ক?

ভারত-নেপাল সীমান্ত বিরোধের কেন্দ্র উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় জেলার কাছে ভারত-নেপাল-চীনের ট্রাই-জংশন সংলগ্ন প্রায় ৩৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি এই তিনটি অঞ্চল নিয়েই দুই দেশের বিরোধ।

বিরোধের মূল উৎস ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির ভিন্ন ব্যাখ্যা। নেপালের দাবি, মহাকালী (কালী) নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরা থেকে হওয়ায় ওই তিনটি এলাকা তাদের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে ভারতের দাবি, নদীর উৎপত্তি কালাপানির কাছের একটি ঝরনা থেকে। ফলে তিনটি এলাকাই ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অংশ।

২০২০ সালে নতুন করে উত্তেজনা

২০২০ সালের মে মাসে ভারত ধারচুলা থেকে লিপুলেখ পাস পর্যন্ত কৌশলগত সড়ক উদ্বোধন করলে বিরোধ নতুন করে তীব্র হয়। কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ককে নেপাল নিজেদের দাবিকৃত ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে নির্মিত বলে অভিযোগ তোলে।

এরপর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি সরকার সংশোধিত রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে কালাপানি, লিপুলেখ ও লিম্পিয়াধুরাকে নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। পরে সেই মানচিত্র সংবিধানসম্মত স্বীকৃতি পায় এবং সরকারি নথি ও প্রচলিত মুদ্রাতেও স্থান পায়। ভারত অবশ্য শুরু থেকেই এই মানচিত্রের বিরোধিতা করে আসছে।

nappel

বালেন্দ্র সরকারের অবস্থান

২০২৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসেন র‍্যাপার থেকে রাজনীতিক হওয়া বালেন্দ্র শাহ। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে তিনি জাতীয়তাবাদী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। তবে সরকারপ্রধান হওয়ার পর অর্থনীতি, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা ও সীমান্ত সংযোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দায়িত্ব নেওয়ার পর বালেন্দ্রকে অভিনন্দন জানানোর মাধ্যমে ইতিবাচক বার্তা দেন। একই সময়ে নেপাল চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখলেও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় উচ্চ সুদের ঋণের বদলে অনুদানভিত্তিক সহায়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে।

লিপুলেখ নিয়ে নতুন টানাপোড়েন

ক্ষমতায় আসার পরই বালেন্দ্র সরকার ভারত ও চীনকে লিপুলেখ গিরিপথ দিয়ে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা আয়োজন না করার আহ্বান জানায়। নেপালের দাবি, ওই গিরিপথ তাদের ভূখণ্ডের অংশ। তবে ভারত জানিয়ে দেয়, ১৯৫৪ সাল থেকেই ওই পথ ব্যবহার করে তীর্থযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে । একই সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে নয়াদিল্লি। সম্প্রতি লিপুলেখ ইস্যুতে চীন ও ব্রিটেনের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করলে ভারত স্পষ্ট জানায়, দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।

সিদ্ধান্ত বদল

এরপর গত ২০ জুলাই বালেন্দ্র সরকার বিতর্কিত মানচিত্র সরিয়ে মুস্তাং জেলার মারং গ্রামের ঐতিহাসিক ‘লো ঘিয়াকার মঠ’-এর ছবি নতুন মুদ্রায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেয়। অনেকেই এটিকে ভারত-নেপাল সম্পর্ক উন্নয়নের কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন, যদিও সরকার একে নিয়মিত মুদ্রা সংস্কারের অংশ বলে ব্যাখ্যা করে।

কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত দেশটির ভেতরেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। বিরোধী দল ও জনমতের চাপের পর শেষ পর্যন্ত সরকার অবস্থান পরিবর্তন করে। ফলে নতুন এক রুপির মুদ্রাতেও আগের মতোই ‘বৃহত্তর নেপাল’-এর মানচিত্র বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন