ইসরাইলগামী ফ্লাই দুবাইয়ের একটি বিমানে পাইলটকে ছুরিকাঘাত করে বিমানটি বিধ্বস্ত করার কথিত চেষ্টার পেছনে শেষ পর্যন্ত কে বা কারা ছিল, তা বলার সময় এখনো আসেনি বলে জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এদিকে ইসরাইলের জাতিসংঘ দূত ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে উল্লেখ করলেও এর জন্য কোনো ব্যক্তি, রাষ্ট্র বা সংগঠনকে দায়ী করেননি।
বুধবার রাতে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি দানন বলেন, ‘এটি এক উগ্রপন্থি ব্যক্তির সন্ত্রাসী হামলা ছিল—এ বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই।’ তবে এর সঙ্গে কোনো ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসী সংগঠনের’ যোগসূত্র এখনো পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, বিমানটি ভূপাতিত করার উদ্দেশ্য ছিল—এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ফ্লাই দুবাই জানিয়েছে, তদন্ত চলাকালে ইসরাইলগামী এবং ইসরাইল থেকে আসা সব ফ্লাইট স্থগিত থাকবে। কর্তৃপক্ষ তথ্য সংগ্রহ করার সময় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ‘আগাম কোনো অনুমান না করার’ আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
ঘটনাটি ঘটে দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাই দুবাইয়ের ১০৭৩ নম্বর ফ্লাইটে। বিমানে ১৭০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন। তাদের অধিকাংশই ছিলেন ইসরাইলি। মাঝ আকাশে এক পাইলট আরেক পাইলটকে ছুরিকাঘাত করে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এরপর কয়েকজন যাত্রী ককপিটে ছুটে গিয়ে অভিযুক্ত হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। ওই সময় বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করছিল। যাত্রী ও ক্রুরা শেষ পর্যন্ত বিমানের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে সেটিকে স্থিতিশীল করেন। পরে সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করে বিমানটি।
ঘটনার পেছনে কারা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা হবে বলে জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হামলাকারীর সহযোগী ছিল কি না, সেটিও খুঁজে দেখা হবে। ইরানের কোনো সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত রয়েছে কি না জানতে চাইলে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এখনই বলা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।’
নেতানিয়াহু জানান, অভিযুক্ত হামলাকারীকে সৌদি কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদ করছে। পরে তাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেওয়া হবে বলে তিনি আশা করছেন। বিমানটি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে যাত্রা করেছিল। এর আগে নেতানিয়াহু জানান, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদে ইসরায়েল অংশ নেবে—এ বিষয়ে তিনি সম্মতি দিয়েছেন।
ইসরাইলি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, অভিযুক্ত হামলাকারী ওমানের নাগরিক। তবে ওমান বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা তাদের কূটনীতিকদের জানায়, ঘটনাটি ইসরাইলি নাগরিক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং দুই দেশের মধ্যে ২০২০ সালে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর বিরুদ্ধে একটি ‘সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা’।
তবে বুধবার সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ঘটনাটি এখনো স্পষ্ট নয়। নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলার পর ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সহকারী পাইলট সম্ভবত একজন সন্ত্রাসী ছিলেন, আবার অন্য কোনো সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিও হতে পারেন—বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়।
বুধবার ফ্লাইদুবাইয়ের ওই বিমানের যাত্রী ও ক্রুদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন নেতানিয়াহুসহ বিভিন্ন বিশ্বনেতা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশিত একটি ভিডিওতে যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুনকে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। পেশায় প্লাম্বার হায়ুন বিমানের ভেতরে কী ঘটেছিল তা বিস্তারিত জানান।
হায়ুন বলেন, তিনি ও অন্য যাত্রীরা চিৎকারের শব্দ শুনেছিলেন এবং বিমানের বায়ুচাপের পরিবর্তন অনুভব করেছিলেন। এরপর বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। তারা ককপিটে জোর করে প্রবেশ করে দেখতে পান, হামলাকারী নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের সামনে অবস্থান করছেন।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাতে হায়ুন বলেন, তিনি হামলাকারীকে ধরে গলায় চেপে ধরেন এবং ককপিট থেকে টেনে বের করেন। অন্যরা যখন হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছিলেন, তখন তিনি বিমানের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন এবং টেলিভিশনে দেখা পদ্ধতি অনুসরণ করে সেটি টেনে ওপরে তোলেন। পরে অন্য ক্রু সদস্যরা বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন।
ছুরিকাঘাতে আহত পাইলটের নাম ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। তিনি ভারতের নাগরিক। ঘটনার সময় তিনি জরুরি সংকেত পাঠান এবং ককপিটের দরজা খুলে দেন, যাতে যাত্রীরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন।
বৃহস্পতিবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মাচ্ছারকে ‘নায়ক’ হিসেবে প্রশংসা করেন। মোদি বলেন, গুরুতর আহত অবস্থাতেও তিনি অন্যদের জীবন রক্ষায় অসাধারণ সাহস ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। তার সাহসিকতার কারণে শত শত মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে এবং একটি বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ভারতের নাগরিক মাচ্ছার মুম্বাইয়ের বাসিন্দা। বর্তমানে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবুকে তিনি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিমানটি নিরাপদে তাবুকে জরুরি অবতরণ করেছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

