ইসরাইলের কাছে প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ভারী বোমা ও যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব। ১৮ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এই ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা বলেন, প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রির অর্থায়নে মার্কিন করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সিনেটকে অবিলম্বে এই বিক্রি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে।
তালিবের বক্তব্যের পেছনে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত বড় একটি মিউনিশন প্যাকেজ। প্যাকেজটির মূল্য প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং এতে ২০ হাজার এমকে-৮৪ ও ২০ হাজার বিএলও-১১৭—মোট ৪০ হাজার ২০০০-পাউন্ডের বোমা রয়েছে। প্রতিটি বোমার ওজন প্রায় ৯০৭ কেজি। এ ছাড়া আরো ২০ হাজার আই-২০০০ পেনেট্রেটর ওয়ারহেডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মোট প্যাকেজে ৬০ হাজার ওয়ারহেড থাকার কথা বলা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত অস্ত্রগুলোর মধ্যে এমকে-৮৪ হলো এমকে-৮০ সিরিজের সবচেয়ে বড় সাধারণ উদ্দেশ্যের বোমাগুলোর একটি। এটি প্রায় ২,০০০ পাউন্ড ওজনের এবং বিস্ফোরণ ও খণ্ড-বিচ্ছুরণের মাধ্যমে ভবন ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। বিএলও-১১৭-ও প্রায় একই ওজনের একটি সাধারণ উদ্দেশ্যের বোমা, যা প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ভুল নির্দেশনা-ব্যবস্থার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়। আর আই-২০০০ পেনেট্রেটর শক্ত কাঠামো বা ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তু ভেদ করে বিস্ফোরণের জন্য তৈরি একটি ‘বাঙ্কার বাস্টার’ ধরনের ওয়ারহেড।
এই অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কংগ্রেশনাল কমিটিগুলোকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে অবহিত করার আগে প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রি নিয়ে সাধারণত মন্তব্য করে না। ফলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী প্যাকেজটির কাঠামো জানা গেলেও আনুষ্ঠানিক বিক্রয়-প্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত শর্ত তখনও সম্পন্ন হয়নি।
অস্ত্রগুলোর অর্থায়নের বিষয়টিও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। প্যাকেজটির বড় অংশ ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং বা বিদেশি সামরিক অর্থায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থায়িত হওয়ার কথা। এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে অর্থ দেয়, যা দিয়ে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনতে পারে। ফলে তালিবের ভাষায়, এই অস্ত্র সরবরাহে মার্কিন করদাতাদের অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে।
রাশিদা তালিব তার পোস্টে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর গাজা-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিকে যুক্ত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে এমন বিপুল পরিমাণ ভারী বোমা সরবরাহ করা হচ্ছে। তার ভাষ্য ও রাজনৈতিক মূল্যায়নকে আলাদা করে দেখা জরুরি; অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ, বোমার ধরন এবং প্রস্তাবিত অর্থায়নের তথ্যগুলো অবশ্য একাধিক মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
২,০০০-পাউন্ডের বোমা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইসরাইলের জন্য একটি চালানে ১৮০০টি ২০০০-পাউন্ডের বোমা এবং ১৭০০টি ৫০০-পাউন্ডের বোমা সরবরাহ স্থগিত করেছিল। সে সময় গাজায় বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা চলছিল।
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৫ সালে তার প্রশাসন কংগ্রেসের প্রচলিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এড়িয়ে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ইসরাইলের জন্য আরো বড় অস্ত্র সরবরাহ অনুমোদন করেছিল। ওই প্যাকেজে ৩৫ হাজার ৫০০টির বেশি এমকে-৮৪ ও বিএলও-১১৭ বোমা ছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও ওয়াশিংটন ইসরাইলের জন্য আরো ৬ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়।
নতুন প্রস্তাবিত প্যাকেজের বিশেষত্ব হলো এর পরিমাণ ও বোমার ধরন। এটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০০০-পাউন্ডের বোমার সবচেয়ে বড় একক বিক্রিগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বোমাগুলোর কিছু ইসরাইলি সামরিক অভিযানে বেসামরিক হতাহতের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে বিভিন্ন পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের ভারী বোমার সম্ভাব্য ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েই মূলত মানবিক ও আইনি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমকে-৮৪-এর মতো বোমার বিস্ফোরণ ও খণ্ড-বিচ্ছুরণের প্রভাব লক্ষ্যস্থলের আশপাশে বিস্তৃত হতে পারে। বিএলও-১১৭-ও একই শ্রেণির ভারী বোমা। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এগুলোর ব্যবহার বেসামরিক মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন উদ্বেগ অস্ত্র বিক্রির সমালোচকদের।
অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান হলো, ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তা-সহায়তায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইসরাইলকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রি নিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তর আনুষ্ঠানিক কংগ্রেশনাল নোটিফিকেশনের আগে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
এখানে কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বড় ধরনের মার্কিন অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোকে অবহিত করা হয় এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইনপ্রণেতারা আপত্তি তুলতে পারেন। তবে অতীতে প্রশাসন ‘জরুরি’ জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন দেখিয়ে কংগ্রেসের স্বাভাবিক পর্যালোচনা প্রক্রিয়া পাশ কাটানোর নজিরও রেখেছে। ফলে তালিবের সিনেটের প্রতি আহ্বান রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তার আহ্বানেই প্রস্তাবিত বিক্রি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নয়।
প্রস্তাবিত বিক্রির বিরোধিতা শুধু রাশিদা তালিবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিনিধি গ্রেগরি মিকসও ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত অস্ত্র প্যাকেজ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। তার উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ গাজা ও লেবাননে এসব ভারী বোমার সম্ভাব্য ব্যবহার এবং বেসামরিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইনসংক্রান্ত প্রশ্ন।
অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন গাজা যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় অঙ্কের অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখছে। ফলে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের এই প্যাকেজটি শুধু একটি অস্ত্র চুক্তি নয়; এটি মার্কিন-ইসরাইল প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, কংগ্রেসের অস্ত্র বিক্রি পর্যালোচনার ক্ষমতা, মার্কিন করদাতাদের অর্থের ব্যবহার এবং গাজায় বেসামরিক সুরক্ষা—এই কয়েকটি প্রশ্নকে একই সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত বিষয় হলো, ‘৪০ হাজার বোমা’ এবং ‘৬০ হাজার বোমা’—এই দুই সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি এড়ানো প্রয়োজন। যে ৪০ হাজার সংখ্যাটি দেয়া হয়েছে, সেটি ২০ হাজার এমকে-৮৪ ও ২০ হাজার বিএলও-১১৭-এর সমষ্টি। অন্যদিকে মোট ৬০ হাজার ওয়ারহেডে অতিরিক্ত ২০ হাজার আই-২০০০ পেনেট্রেটর রয়েছে। তাই ৪০ হাজার হলো ২০০০-পাউন্ডের নির্দিষ্ট দুই ধরনের বোমার সংখ্যা; ৬০ হাজার হলো পুরো প্যাকেজে উল্লেখিত ওয়ারহেডের সংখ্যা।
রাশিদা তালিবের আহ্বানের মূল বক্তব্য হলো, গাজায় ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিপুল অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা উচিত এবং সিনেটের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিপরীতে মার্কিন প্রশাসন ইসরাইলের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার অধিকারকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। প্রস্তাবিত ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে পরবর্তী মার্কিন প্রশাসনিক ও কংগ্রেশনাল প্রক্রিয়ার ওপর।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, এপি, ওয়াশিংটন পোস্ট, এবিসি নিউজ, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও দ্য গার্ডিয়ান
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


