সৌদি আরবের কাছে বিপুল পরিমাণ মার্কিন অস্ত্র বিক্রির উদ্যোগ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য রাশিদা তালিব। মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ১৭ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে সৌদি আরব এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ, অবরোধ ও অন্যান্য সামরিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর পরও ট্রাম্প প্রশাসন রিয়াদের কাছে প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের অস্ত্র দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, যার মধ্যে ২০০০ পাউন্ড ওজনের বোমাও রয়েছে। তিনি মার্কিন সিনেটকে প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রি ঠেকানোর আহ্বান জানান।
তালিবের বক্তব্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েমেন নীতিকে ঘিরে কংগ্রেসের পুরোনো বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে। তার অভিযোগ, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, জ্বালানি, গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক সহায়তা ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এসব বক্তব্য তালিবের রাজনৈতিক অবস্থান ও মূল্যায়ন হিসেবে দেখা উচিত; অস্ত্র বিক্রির আনুষ্ঠানিক নথি থেকে যে তথ্য নিশ্চিত হয়, তা হলো ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের জন্য বিপুল পরিমাণ জয়েন্ট ডিরেক্ট অ্যাটাক মিউনিশন (জেডিএএম)-এর গাইডেন্স কিট এবং বোমা সরবরাহের প্রস্তাব করেছে।
মার্কিন সিনেটর এড মার্কি, জেফ মার্কলি ও বার্নি স্যান্ডার্স ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের কাছে প্রস্তাবিত প্রচলিত অস্ত্র বিক্রির বিরুদ্ধে যৌথ ‘রেজল্যুশন অব ডিসঅ্যাপ্রুভাল’ বা অনুমোদন-বিরোধী প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। মার্কির কার্যালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, প্রস্তাবিত অস্ত্রের মধ্যে হাজার হাজার জেডিএএম এবং ২০০০-পাউন্ডের ৫০০০ বোমা রয়েছে। কংগ্রেসের এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রির বিরুদ্ধে আইনগতভাবে আপত্তি তোলা।
২০০০-পাউন্ডের বোমা ব্যবহারের বিষয়টি বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। রাশিদা তালিব দাবি করেছেন, এ ধরনের ভারী বোমা বেসামরিক মানুষের জন্য ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি করে। তার বক্তব্যের রাজনৈতিক ভাষা ও মূল্যায়ন আলাদা করে দেখলেও, প্রস্তাবিত অস্ত্র প্যাকেজে ২০০০-পাউন্ডের ৫০০০ বোমা থাকার তথ্য মার্কিন সিনেটর মার্কির দপ্তরের বিবৃতিতেও নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই বিতর্কের পটভূমিতে রয়েছে ইয়েমেন যুদ্ধ। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবসহ জোটের অংশীদারদের অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিয়েছে। যুদ্ধের ফলে ইয়েমেনে ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি হয় এবং জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সহায়তার সংকটের কথা তুলে ধরেছে। তবে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে সামরিক অভিযান ও মানবিক পরিস্থিতির দায় এবং বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিতর্ক রয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক সম্পর্ক অবশ্য শুধু এই অস্ত্র প্যাকেজেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কাছে সম্ভাব্য ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, ৪৯টি সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিন এবং অন্যান্য সরঞ্জামসহ আনুমানিক ২৪.৩ বিলিয়ন ডলারের একটি পৃথক সামরিক বিক্রির পথও উন্মুক্ত করেছে। এই বিক্রির জন্য এখনো কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।
এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। ইসরাইলের সামরিক প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার সম্ভাবনা সেই নীতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়েও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য অস্ত্রনীতি ও সৌদি-আমেরিকা প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়েও একটি পৃথক চুক্তি কংগ্রেসে পাঠিয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর কয়েকজন মার্কিন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ওই চুক্তি ঠেকাতে আলাদা রেজল্যুশন অব ডিসঅ্যাপ্রুভাল উত্থাপন করেন। তাদের উদ্বেগের একটি বিষয় হলো, প্রস্তাবিত চুক্তিতে সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের ওপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের ২০০৯ সালের চুক্তির মতো কঠোর বিধিনিষেধ নেই। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য বলছে, চুক্তিতে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অপ্রসারণ বা ‘নন-প্রলিফারেশন’ ব্যবস্থা রয়েছে।
ফলে সৌদি আরবকে ঘিরে ওয়াশিংটনের বর্তমান নীতি একই সময়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিস্তৃত হচ্ছে—প্রচলিত অস্ত্র সরবরাহ, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনা এবং বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা। এর বিপরীতে মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্য এসব উদ্যোগে মানবাধিকার, ইয়েমেন যুদ্ধ, আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য এবং পারমাণবিক অপ্রসারণের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
রাশিদা তালিবের বক্তব্য তাই বৃহত্তর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিতর্কের একটি অংশ। তার আহ্বান হলো সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা; অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার দিকে এগোচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে, কারণ মার্কিন আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ধরনের বড় অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের পর্যালোচনা ও আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে।
এভাবে সৌদি আরবকে অস্ত্র বিক্রির বর্তমান বিতর্ককে শুধু একটি নির্দিষ্ট অস্ত্রচুক্তি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি একই সঙ্গে ইয়েমেন যুদ্ধের উত্তরাধিকার, সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, ইসরায়েলের সামরিক প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য এবং পারমাণবিক অপ্রসারণ—এই পাঁচটি আন্তঃসম্পর্কিত প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সূত্র: প্রেস টিভি, রয়টার্স ও www.markey.senate.gov
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


