ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো
ছবি: রয়টার্স

বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভরসার জায়গা ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক টিকে ছিল। তবে মঙ্গলবার ইউএই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও সব ধরনের লেনদেনে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় সেই সম্পর্ক বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ইরান শুধু তাদের পণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হারাবে না, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথও হারাবে।

বিজ্ঞাপন

ইউএইর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আফরা আল হামেলি বলেছেন, ‘আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে’ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের ওপর তৈরি হওয়া চাপকে এই সিদ্ধান্ত সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এরপর ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে। এসব দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি জ্বালানি রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের অর্থনীতির ‘ফুসফুস’

ইরান থেকে পারস্য উপসাগরের ওপারে মাত্র প্রায় ৫০ মাইল দূরে ইউএই। দেশ দুটির মধ্যে শত শত বছর ধরে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে ইউএইতে কয়েক লাখ ইরানি বসবাস করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার ইউএই।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসেছে ইউএই থেকে। ইলেকট্রনিক পণ্য, মূল্যবান ধাতু ও ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ইউএইর মাধ্যমে ইরানে গেছে।

ইরানের পণ্যের অন্যতম বড় রপ্তানি গন্তব্যও ইউএই। বিশেষ করে খাদ্য ও মসলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সেখানে রপ্তানি করে ইরান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইউএইকে, বিশেষ করে দেশটির সবচেয়ে বড় শহর দুবাইকে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দুবাই ইরানি পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুনঃরপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু লেবার বলেন, ‘ইউএইকে ইরানের ফুসফুস বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পায়।’

অবশ্য ইরানের সঙ্গে ইউএইর এই সম্পর্ক নিয়ে অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা অভিযোগ ও চাপ দিয়েছেন। ইউএইর কর্মকর্তারা বলেন, তারা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত হলে ব্যবস্থা নেন। ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইউএই সহায়তা করে—এমন অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছেন।

নিষেধাজ্ঞায় কতটা ক্ষতি হবে ইরানের

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত নানা বিষয়ে ইরান ও ইউএইর মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও পারস্পরিক স্বার্থে দুই দেশ বছরের পর বছর বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

অ্যান্ড্রু লেবারের মতে, ইউএইর নিষেধাজ্ঞা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বড় ধরনের বিচ্ছেদ’ তৈরি করবে। তবে ইরানের অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের উপসাগরীয় অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ রবার্ট মোগিয়েলনিকি বলেন, ইউএইর এই পদক্ষেপ ইরানের অর্থনীতির জন্য এমন বড় আঘাত হবে না, যা পুরো অর্থনীতিকে ভেঙে দেবে।

তার মতে, ইরান তার অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তুলেছে। দেশটি ‘স্বনির্ভরতা’কে অগ্রাধিকার দেয়। তাই ইরানের অর্থনীতি ইউএইর ওপর অতটা নির্ভরশীল নয়।

তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের মিয়াদ মালেকি ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তার মতে, এই যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে ইউএইর নিষেধাজ্ঞা হবে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপ’। এমনকি এটি যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তিনি বলেন, এ অঞ্চলে অন্যান্য নৌ অবরোধের সঙ্গে ইউএইর বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্ত যুক্ত হওয়ায় ইরানের ওপর এর প্রভাব আরো বেশি হতে পারে।

তবে ইউএই সরকার কতটা দ্রুত এবং কঠোরভাবে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইরানি হামলার পর ইউএইর অবস্থান

ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালানোর সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়া দেশগুলোর একটি ইউএই। দেশটি হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।

ইউএই সরকার বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্ত ঠিক কখন নেওয়া হয়েছে বা এর পেছনে নির্দিষ্ট কী কারণ রয়েছে, তা জানায়নি।

তবে গত সপ্তাহে ইউএই অভিযোগ করে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তাদের একটি তেলবাহী জাহাজে ইরান হামলা চালিয়েছে। এরপর ইউএইর ভূখণ্ডের দিকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলেও অভিযোগ করে দেশটি। ইরান অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইরানের হামলার মুখে ইউএই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের জোট আরো জোরদার করেছে।

এই নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউএইর নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক

অ্যান্ড্রু লেবার বলেন, উপসাগরের আরব অংশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ওমান এর একটি উদাহরণ। গত কয়েক দশকে ইরান ও ওমানের মধ্যে বাণিজ্য বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সময়ও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় ছিল।

তবে ইউএইর তুলনায় অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক কম। রবার্ট মোগিয়েলনিকির মতে, এসব দেশের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক মূলত ‘সীমিত ও গুরুত্বহীন’।

তবু যুদ্ধ ও ইরানের আঞ্চলিক হামলার প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইউএই ও ওমানের অর্থনীতিতে সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে।

আইএমএফের হিসাবে, আগামী পাঁচ বছরে উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট উৎপাদন ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন