ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি নেতা হাসান সালামেহকে ৯ বার গুলি

ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি নেতা হাসান সালামেহকে ৯ বার গুলি

ফিলিস্তিনের প্রভাবশালী বন্দি হাসান সালামেহকে কারাগারের কক্ষে মারধরের পর ৯বার গুলি করেছে ইসরাইলি কারারক্ষীরা। গত মাসে সংঘটিত এ ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তার বাগ্‌দত্তা ঘুফরান জামেল এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটি (পিপিএস)। তাদের দাবি, ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির কারাগারে সালামেহর কক্ষে গিয়ে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়ার পর এ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

৫৫ বছর বয়সি সালামেহর ওপর হামলার বিষয়ে পিপিএস জানতে পারে সোমবার তার সঙ্গে এক আইনজীবীর সাক্ষাতের পর। আইনজীবীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং সালামেহর বাগ্‌দত্তার বক্তব্য অনুযায়ী, তাকে ব্যাপক মারধর করা হয় এবং শরীর লক্ষ্য করে ৯টি গুলি ছোড়া হয়।

বিজ্ঞাপন

তবে কী ধরনের গুলি ব্যবহার করা হয়েছে এবং ঠিক কী পরিস্থিতিতে তাকে গুলি করা হয়, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পিপিএসের ধারণা, গুলিগুলো রাবার-আবৃত হতে পারে।

পিপিএস জানিয়েছে, কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে আইনজীবীদের সাক্ষাতের ওপর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধ থাকায় হামলার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সংগঠনটি সালামেহর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ঘটনার প্রকৃত বিবরণ প্রকাশ এবং তার শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

সালামেহর বাগ্‌দত্তা ঘুফরান জামেল স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বেন-গভিরের কারাগার পরিদর্শনের আগে ও পরে সালামেহকে মারধর করা হয়। মন্ত্রীর চলে যাওয়ার পর ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তার কক্ষে ঢুকে মুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। একপর্যায়ে তাকে লক্ষ্য করে নয়টি গুলি ছোড়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জামেলের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার তিন দিন পর সালামেহর শরীরের আঘাতের ছবি তোলার জন্য তাকে কক্ষ থেকে বের করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়ে আবার কারাকক্ষে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তাকে শুধু ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। সোমবার আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ও তার শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাকে অত্যন্ত ক্লান্ত ও দুর্বল দেখাচ্ছিল।

বন্দিদের ওপর নির্যাতন বাড়ার অভিযোগ

পিপিএসের দাবি, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিশেষ করে পরিচিত ও প্রভাবশালী নেতাদের লক্ষ্য করে নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। সংগঠনটির ভাষায়, এটি কেবল দমন-পীড়ন বা শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বন্দিদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

সংগঠনটি আরো বলেছে, কারাগারে বন্দি নেতারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ধারাবাহিক দমন-পীড়ন এবং ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের প্রকাশ্য হত্যার হুমকির মুখে রয়েছেন। বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের ওপর বিধিনিষেধ এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণের অভাব এ ধরনের ঘটনার জবাবদিহি নিশ্চিতের পথও কঠিন করে তুলছে।

গত সেপ্টেম্বরে বেন-গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। এতে তাকে নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে সালামেহর কারাকক্ষে প্রবেশ করতে দেখা যায়। সেখানে তিনি সালামেহকে হত্যার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হতে পারলে সালামেহর মতো বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যবস্থা করবেন বলেও হুমকি দেন তিনি।

কে এই হাসান সালামেহ

১৯৭১ সালে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শরণার্থীশিবিরে জন্ম নেওয়া হাসান সালামেহ ১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদার সময় ইসরাইলি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ আন্দোলনে যুক্ত হন। পরে তিনি হামাসের সশস্ত্র শাখা আল-কাসসাম ব্রিগেডের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন।

১৯৯৬ সালে ইসরাইল তাকে কয়েকটি বোমা হামলার পরিকল্পনার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। ওই হামলায় বহু ইসরাইলি নিহত ও আহত হয়েছিলেন বলে ইসরাইলের অভিযোগ। সালামেহ বলেছিলেন, হামলাগুলো ছিল হামাসের বোমা তৈরির বিশেষজ্ঞ ইয়াহিয়া আয়াশকে হত্যার প্রতিক্রিয়া।

তাকে ৪৮টি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় ৩০ বছর ধরে কারাবন্দি থাকা সালামেহ এর মধ্যে মোট ১৪ বছর নির্জন কারাকক্ষে কাটিয়েছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। শারীরিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, অনাহারে রাখা, চিকিৎসা না দেওয়া এবং অপমান-হয়রানির অভিযোগও উঠেছে।

গত মাসে ইসরাইলের দুটি মানবাধিকার সংগঠন—ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরাইল এবং পাবলিক কমিটি এগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরাইল—কারাগারে বন্দিদের ওপর কাছ থেকে রাবার-আবৃত গুলি ছোড়ার ২১টি ঘটনার সাক্ষ্য সংগ্রহের কথা জানায়। সংগঠন দুটি এ ধরনের ঘটনাকে বিপজ্জনক চর্চা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তাদের নথিভুক্ত একটি ঘটনায় এক ফিলিস্তিনি বন্দির অণ্ডকোষে রাবার-আবৃত গুলি ছোড়া হয়। এতে তার ডান অণ্ডকোষ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা অপসারণ করতে হয়।

সালামেহর ওপর হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত গুলির ধরন এবং ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে তার বাগ্‌দত্তা ও বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনটির অভিযোগ, যথাযথ চিকিৎসা ও সুরক্ষা না পাওয়ায় তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই ও প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন