ইসরাইলের কারাগারগুলোতে মুসলিমদের হত্যা-নির্যাতন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ইসরাইলের কারাগারগুলোতে মুসলিমদের হত্যা-নির্যাতন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে

ইসরাইলের কারাগারগুলোতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতন, অমানবিক আচরণ এবং মৃত্যুর ঘটনা এখন এক ধরনের স্বাভাবিক বাস্তবতাতে পরিণত হয়েছে বলে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। অভিযোগ উঠেছে, এসব ঘটনা আর গোপনও রাখা হচ্ছে না; বরং বিভিন্ন ছবি, সাক্ষ্য ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনের মাধ্যমে একের পর এক সামনে আসছে।

বিজ্ঞাপন

এরই মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন গাজার উত্তরাঞ্চলের কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুসাম আবু সাফিয়া। প্রায় ১৮ মাস আগে ইসরাইলি বাহিনী তাকে আটক করে। এরপর থেকে কোনো অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই তাকে আটক রাখা হয়েছে। সম্প্রতি আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি বলেন, এটাই শেষ। আমি মনে করি না আমি বেঁচে ফিরতে পারব। আমাকে এখানে হত্যা করার জন্যই আনা হয়েছে।

আইনজীবীর বরাতে জানা গেছে, আটক অবস্থায় তাকে হাতুড়ি ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়েছে, প্রতিদিন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে এবং একাধিকবার তিনি জ্ঞান হারিয়েছেন। সাম্প্রতিক প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, একসময় গাজার অবরুদ্ধ স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত এই চিকিৎসক এখন অত্যন্ত শীর্ণকায় হয়ে পড়েছেন।

গত জুনে তাকে রাকেফেত নামে একটি ভূগর্ভস্থ কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। একসময় সংগঠিত অপরাধীদের জন্য নির্মিত এই কারাগার অমানবিক পরিবেশের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালের শেষ দিকে এটি পুনরায় চালু করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে বন্দিদের দিনের আলো দেখারও সুযোগ দেওয়া হয় না, যা জেনেভা কনভেনশনের পরিপন্থী।

বর্তমানে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি ‘প্রশাসনিক আটক’ ব্যবস্থার আওতায় বন্দি রয়েছেন। এই ব্যবস্থায় কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই ছয় মাস অন্তর অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকাদেশ নবায়ন করা যায়। এসব বন্দির মধ্যে প্রায় ২০০ জন শিশু রয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আলী আল-সামৌদির অভিজ্ঞতাও একই ধরনের অভিযোগকে সামনে এনেছে। কারামুক্তির সময় তার ওজন প্রায় ৬০ কেজি কমে যায়, যা তার মোট শরীরের ওজনের প্রায় অর্ধেক। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, এখানকার কারাগার শব্দের অর্থ নরক। আমাদের সঙ্গে যা করা হয়েছে, সবই ছিল শাস্তি ও প্রতিশোধ।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবিও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, গাজার এক ফিলিস্তিনি ব্যক্তিকে শুধু অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায় উপুড় করে একটি কাঠের তক্তা ও লোহার রডের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। ছবিটি পোস্ট করা এক ইসরাইলি সেনা এর ক্যাপশনে হিব্রু ভাষায় লিখেছেন, শুভ সকাল। সমালোচকদের মতে, এই ছবি বন্দিদের অপমান ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি নীতির অংশ। অভিযোগ রয়েছে, বহু ফিলিস্তিনির লাশও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় না। কিছু লাশ নম্বরযুক্ত কবরস্থানে সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দাফন করা হয়, আবার কিছু হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়। হেফাজতে মারা যাওয়া অন্তত ১০০ ফিলিস্তিনির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কেও কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া গাজা থেকে আটক হওয়ার পর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া প্রায় দুই হাজার মানুষের অবস্থান জানার চেষ্টা করছে ইসরাইলভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হামোকেদ। সংস্থাটির মতে, এসব ঘটনা ‘জোরপূর্বক গুম’-এর শামিল।

মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসক, সাংবাদিক, সমাজকর্মীসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। তাদের মতে, এটি শুধু ব্যক্তিগত নির্যাতনের বিষয় নয়; বরং ফিলিস্তিনি সমাজের নেতৃত্ব, সামাজিক কাঠামো ও মনোবল ভেঙে দেওয়ার একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এসব অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি এখনও জোরালো হয়নি। সম্প্রতি জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি বাহিনীর কথিত যৌন সহিংসতার নথিভুক্ত অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...