অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়ন ও সামরিক তৎপরতা ব্যাপক মাত্রায় বাড়িয়েছে ইসরাইল। একের পর এক ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামে অভিযান চালাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি ও সেনাচৌকি সম্প্রসারণের কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সামরিক অভিযানের পাশাপাশি সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা জোরদার করেছে কট্টরপন্থি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরাও।
আগ্রাসনের অংশ হিসেবে দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা নিহতের ঘটনায় অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। গত শুক্রবার দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে সামরিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল এলা ওয়াওয়েয়া জানান, নাবলুসের নিকটবর্তী তাল গ্রামে অভিযুক্তদের বাড়িতে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সাময়িকভাবে সিলগালা করার উদ্দেশ্যে এই অভিযান চালানো হয়েছে।’
ঘাতক হামলায় অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ধ্বংস করা ইসরাইলের দীর্ঘদিনের একটি নীতি। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পদক্ষপের কড়া সমালোচনা করে আসছে।
সংস্থাগুলোর মতে, এটি একটি সমষ্টিগত শাস্তি, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
গত শুক্রবার নাবলুসের দক্ষিণ-পশ্চিমে ইসরাইলি বাহিনী ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষে চার ফিলিস্তিনি এবং দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হন।
ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর মতে, অবরুদ্ধ তাল গ্রামে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালালে এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়। গ্রামটি অবৈধ ইসরাইলি বসতি 'হাভাত গিলাদ'-এর কাছে অবস্থিত।
স্থানীয় ও নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ফিলিস্তিনিরা নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষা করার চেষ্টা করলে বসতি স্থাপনকারীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তবে এই ঘটনায় সম্পূর্ণ বিপরীত দাবি করেছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় ঘুরতে আসা ইসরাইলিদের ওপর হামলার খবর পেয়ে তারা সেনা পাঠায়।
এদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে অভিযানে ৮০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরাইলি বাহিনী। এছাড়া কুসরা শহরে আর-রাহমা মসজিদে আগুন দিয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা ।
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীরাই মসজিদটিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
তবে এ ঘটনায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা-ও জানা যায়নি।
তবে একই সময়ে পশ্চিম তীরজুড়ে অভিযান চালিয়ে অন্তত ৮০ ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরাইলি বাহিনী। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, নাবলুস, রামাল্লাহ, জেনিন, হেবরন, বেথলেহেম ও তুলকারেমসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া জেনিন শহর ও আশপাশের একাধিক গ্রামে বড় পরিসরের সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইসরাইলি বাহিনী।
ইসরাইলি সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, পশ্চিম তীরের প্রধান সড়ক ও বিভিন্ন গ্রামের প্রবেশপথে অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসিয়ে কঠোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে চার ফিলিস্তিনি ও দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার পর পশ্চিম তীরে নিরাপত্তা অভিযান আরো জোরদার করেছে ইসরাইল। ধরপাকড় ও হয়রানির মাত্রাও বেড়েছে।
পশ্চিম তীরে এমন সহিংসতা নতুন কিছু নয়। তবে এই মুহূর্তে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসরাইলের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আর মাত্র তিন মাস বাকি। এমন সময়েই পশ্চিম তীরে দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার ঘটনা ঘটল।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপ বলছে, আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছেন দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফলে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই এখন তার প্রধান চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহু তার কট্টর ডানপন্থি সমর্থক গোষ্ঠীর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। আর এই ডানপন্থি ভোটারদের সন্তুষ্ট করার প্রধান উপায় হলো ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করা এবং দ্রুত নতুন অবৈধ বসতি গড়ে তোলা। তাই ভোটের মাঠে নিজের অবস্থান শক্ত করতেই নেতানিয়াহু প্রশাসন পশ্চিম তীরে এই নীতি গ্রহণ করেছে। মূলত আসন্ন নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাই পশ্চিম তীরে ইসরাইলি আগ্রাসন বাড়ার অন্যতম কারণ।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

