ইসরাইল বাড়াবাড়ি করলে যেসব পদক্ষেপ নেবে তুরস্ক

আমার দেশ অনলাইন

ইসরাইল বাড়াবাড়ি করলে যেসব পদক্ষেপ নেবে তুরস্ক
২০২৩ সালে নিউইয়র্কে একটি বৈঠকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত।

সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যকার বাগযুদ্ধ আরো তীব্রতর হয়েছে। বলা যায় দুই আঞ্চলিক শক্তির মধ্যকার গভীর বিভেদকে উন্মোচন করে দিয়েছে এই বাগযুদ্ধ।

গত বছর আন্তর্জাতিক জলসীমায় গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ওপর হামলার প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে তুরস্ক।

বিজ্ঞাপন

এর জবাবে নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলেন। তিনি এরদোয়ানের বিরুদ্ধে নিজ দেশের কুর্দি নাগরিকদের গণহত্যার অভিযোগ করেন ।

এছাড়াও দুর্নীতি ও আইনি লড়াই একটি অত্যন্ত জটিল পর্যায়ে রয়েছে নেতানিয়াহু। যেখানে দেশটির প্রসিকিউটরদের দীর্ঘ কারাদণ্ডের দাবিকে নেতানিয়াহু তার বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক প্রচার বা উইচ হান্ট হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন। আর এ পরিস্থিতিতে বলা যায় তুরস্কের বিরোধীতা করা একটি গুরুতর পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন নেতানিয়াহু।

এদিকে নির্বাচনের বছর হিসেবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। কেননা ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা যুদ্ধবিরতির কারণে দেশে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছিল। রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া এবং কিছু ভোটারের মন জয় করার জন্য এরদোয়ানকে তিরস্কার করা একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ছিল নেতানিয়াহুর।

একই সময়ে, ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও এই বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। নেতানিয়াহুর মতো বেনেটও তুরস্কের বিরুদ্ধে একের পর এক উস্কানিমূলক মন্তব্য করেন।

ইতোমধ্যে, বেনেট তুরস্ককে নতুন ইরান হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এর আগে আঙ্কারার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন যে ইরানের পর আমরা চুপ করে থাকব না।’

এটি এখন আর নিছক কথার লড়াই নয়, বরং চলমান এই বাগযুদ্ধ দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের পথ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে।

এটা মনে রাখা দরকার যে, গাজায় ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ , সিরিয়ায় নতুন সরকারের আগমন এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—যার মধ্যে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরাইলের গভীরতর সম্পর্কও অন্তর্ভুক্ত—এসব নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই তীব্র মতবিরোধ বিদ্যমান ।

তাহলে সত্যিই যদি তুরস্ক ও ইসরাইল কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো চরম পদক্ষেপ নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তবে কী ঘটবে?

তেল প্রবাহ

অনেকে যুক্তি দিয়েছেন যে, জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হলে তুরস্ক বাকু-তিবিলিসি-জেহান পাইপলাইনের মাধ্যমে আজারবাইজানের তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে।

মিডল ইস্ট আইয়ের কাছে থাকা তথ্যমতে, ইসরাইলের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আসে জ্বালানি তেলের এই রুট দিয়ে। আর এটি দেশটির মোট তেল ব্যবহারের প্রায় ৫০ শতাংশ পূরণ করে।

২০২৪ সালের মে মাস থেকে ইসরাইলের ওপর তুরস্কের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তেলের প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা উভয়েই এই প্রবাহ বজায় রাখতে একটি ছায়া নৌবহরের ব্যবহারের জটিল প্রক্রিয়া অনুসরণ করছেন।

যদি তুরস্ক আজারবাইজানের ওপর তার প্রভাব খাটিয়ে তেল প্রভাবের ভালভগুলো বন্ধ করে দেয়, তবে তা অবশ্যই স্বল্পমেয়াদী বিঘ্ন ঘটাবে, কিন্তু তা কতদিন স্থায়ী হবে তা অনিশ্চিত।

বর্তমানে ইসরাইলের ওপর কোনো আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা নেই এবং দেশটি উন্মুক্ত বাজার থেকে তেল ক্রয় করতে পারে।

এদিকে, ইসরাইলি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, আজারবাইজান থেকে তেল কেনা বাকুর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে। আর আজেরি জনগোষ্ঠী সেই কৌশলগত অংশীদারিত্বকে সম্মান জানাতে চায়।

আকাশসীমা

আরেকটি বহুল আলোচিত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হতে পারে যে আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়া। যেখানে তুরস্ক ইসরাইলের বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য তার আকাশসীমা বন্ধ করে দেবে। এর ফলে ইসরাইলি ও আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর ভাড়া বেড়ে যাবে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেখানে রুট দীর্ঘতর হয়ে যাবে যার অর্থ হবে অধিক জ্বালানি খরচ, কর্মীদের কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি। একইসঙ্গে সময়সূচিতর ব্যাঘাত, যার ফলে ইসরাইলিদের জন্য আবশ্যিকভাবে টিকিটের মূল্য বাড়বে এবং বিমান সংস্থাগুলোর মুনাফা কমে যাবে।

রাশিয়া ও আজারবাইজানের মতো গন্তব্যে পৌঁছানো আরো জটিল হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে কৃষ্ণ সাগরের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার মাধ্যমে হয়তো সেই অসুবিধাগুলো কিছুটা লাঘব করা যেতে পারে। এছাড়াও, অন্যান্য ফ্লাইটগুলোকে তুরস্ক এড়িয়ে অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়া লাগতে পারে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমান্বয়ে উন্মুক্ত হওয়া সৌদি আরবসহ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক আকাশসীমায় ইসরাইলের প্রবেশাধিকার, তুরস্কের যেকোনো নিষেধাজ্ঞার কৌশলগত প্রভাবকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ব্যাপারে কী হবে

বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার পর থেকে ইসরাইলের সঙ্গে তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, কিন্তু কিছু তুর্কি পণ্য এখনও তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ইসরাইলে পৌঁছায়।

২০২৫ সাল নাগাদ তুরস্ক ভ্রমণ করা বার্ষিক ইসরাইলি পর্যটকের পরিমাণ প্রায় লাখে পৌঁছালেও, তা এতটা উল্লেখযোগ্য নয় যে আঙ্কারা তার নাগরিকদের তুরস্কে ভ্রমণে বাধা দিলে ইসরাইল খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।

দুই দেশের মধ্যে প্রকৃত পারস্পরিক নির্ভরশীলতার অভাবই ইসরাইলের ওপর আঙ্কারার সীমিত প্রভাবের মূল কারণ। একসময় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য তুরস্কের জন্য অত্যন্ত লাভজনক ছিল, কিন্তু গাজায় গণহত্যার কারণে এর বেশিরভাগই বন্ধ হয়ে যায়।

দর কষাকষির একটি সম্ভাব্য মাধ্যম হতে পারত দীর্ঘ-আলোচিত ইস্টমেড পাইপলাইন, যার মাধ্যমে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন থেকে গ্যাস তুরস্কে এনে ইউরোপে রপ্তানি করার কথা ছিল। কিন্তু গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ কার্যকরভাবে সেই প্রকল্পটিকে শেষ করে দিয়েছে।

তুরস্কের যেসব বিষয় ইসরাইলের আচরণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে তা হল- তুরস্কের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করা। এর পাশাপাশি, আঙ্কারা ন্যাটো দেশগুলোর সাথে মিত্রতার গভীর সম্পর্কে বিশ্বাসী। একই সঙ্গে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মিশরের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সাথে পুনরায় জোটবদ্ধ হওয়াও ইসরাইলেকে প্রভাবিত করছে।

তবে তুরস্ক মনে করে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে তার জটিল সম্পর্ক, ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে তার প্রধান ভূমিকা, রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ের সাথেই তার অনন্য সংযোগ এবং আফ্রিকা ও এশিয়ার সাথে তার ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক ভবিষ্যতে যেকোনো গুরুতর উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধ করার জন্য যথেষ্ট সুরক্ষা প্রদান করবে।

এখন সময়ই বলে দেবে, কী ঘটবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...