হুথিদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে সৌদি, উদ্বেগ বাড়ছে রিয়াদের

হুথিদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে সৌদি, উদ্বেগ বাড়ছে রিয়াদের

সৌদির রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিরা বারবার প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছেন। শনিবারের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। রোববারের হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা এবং আকাশে উড়ন্ত সামরিক বিমানে জ্বালানি সরবরাহ। গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তাও দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এফ. গ্রেগরি গজের মতে, সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং বৃহত্তর সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরানকে হুথিদের হামলা বন্ধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা। তবে ট্রাম্প সৌদি আরবের কথা কতটা শুনবেন, তা স্পষ্ট নয়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ইয়াসমিন ফারুক বলেছেন, সৌদি সরকার সম্ভবত সংঘাতের অবসানে আলোচনায় বসার আগে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করবে। হুথিদের এমন হামলা চালানোর সক্ষমতা থাকা অবস্থায় আলোচনায় বসার সময় এখনো আসেনি।

হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের সৌদি বিমানবন্দর ব্যবহার না করার বিষয়ে বারবার সতর্ক করেছেন। তিনি বিমানবন্দরগুলোকে তাদের বাহিনীর জন্য ‘অভিযানের ক্ষেত্র’ বলে ঘোষণা করেছেন।

হামলাগুলো সৌদির বড় বড় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আয়োজনের ঠিক আগে ঘটেছে। এর মধ্যে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলনও রয়েছে, যেখানে সাধারণত বিশ্বনেতা, ধনকুবের ও বড় প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা অংশ নেন। হামলার পর এসব গুরুত্বপূর্ণ অতিথি রিয়াদে যেতে নিরাপদ বোধ করবেন কি না, তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি গজের বক্তব্য অনুযায়ী, হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের অবকাঠামোর ক্ষতি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে; বিপরীতে হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনের রাজধানী সানার বড় অংশ ইতোমধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।

এক দশক আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান হামলা ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছিল। সহিংসতা, ক্ষুধা ও রোগে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যুতে যুদ্ধের ভূমিকা ছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছিল, অভিযানটি বেসামরিক মানুষকে অসমভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। ২০১৮ সালে সৌদি যুদ্ধবিমান একটি স্কুলবাসে হামলা চালালে ৪৪ শিশু ও ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক নিহত হন।

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ভেঙে জুলাইয়ে সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর হুথিরা সৌদি আরবকে দায়ী করে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হামলার দায় স্বীকার করে বলেছিল, অনুমতি ছাড়া একটি ইরানি বিমানকে অবতরণ ঠেকাতেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, সৌদি আরবের আর্থিক ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ইয়েমেন সরকার এককভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

এরপর হুথিরা ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ নীতি ঘোষণা করে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরে ইয়েমেনি সরকারপন্থী বাহিনীর নতুন অভিযান এবং সৌদি বিমান হামলার মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধ আবার তীব্র হয়।

হামলার মধ্যেও সৌদির স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। রিয়াদে বিদেশি কূটনীতিকদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কবার্তা দিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও শহরে জ্বালানিমন্ত্রীদের একটি বৈঠক পূর্বনির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হয়। সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেন, বিদেশি অতিথিদের অনুপস্থিতি দুঃখজনক হলেও তাদের জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রধান বব ম্যাকন্যালি জানান, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট পর সেখানে হামলা হয়।

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার নতুন অভিযান ঘোষণা করেছে এবং সৌদি আরব তাকে সমর্থন করতে নতুন বিমান হামলা শুরু করেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় লোহিত সাগর সৌদি তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথে পরিণত হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন