ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে সৌদি আরব। রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করার চাপ বাড়ছে। কিন্তু এক দশক আগে ইয়েমেনে দীর্ঘ সামরিক অভিযান চালিয়েও হুথিদের পরাস্ত করতে না পারার অভিজ্ঞতা এবারও রিয়াদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও হুথিদের পুরোপুরি পরাস্ত করা সৌদি আরবের জন্য সহজ হবে না।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত সপ্তাহে একাধিক হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে শনিবারের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলার প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি। তবে মার্কিন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যাত্রী টার্মিনালে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছিল।
এই হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটির কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিকল্পনা হলো, তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা। কিন্তু রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত থাকলে সেই পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সামরিক অভিযানেও রয়েছে ঝুঁকি
সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক জোটের নেতৃত্ব দেয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা ছিল ওই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। দীর্ঘ বিমান হামলা ও সামরিক তৎপরতার পরও হুথিরা উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। যুদ্ধটি দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক যুদ্ধ বিস্তৃত হওয়ার পর পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়তে থাকে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীও হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা পুনর্দখলের অভিযান জোরদার করেছে।
সৌদি আরবের সামনে এখন মূলত দুটি পথ—হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরো বিস্তৃত করা অথবা সংঘাতের অবসানে রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করা। তবে উভয় পথেই রয়েছে জটিলতা। সামরিক অভিযান হুথিদের দুর্বল করতে পারলেও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের শহর, জ্বালানি স্থাপনা ও পরিবহন অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অন্যদিকে, হুথিদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ও সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ থাকায় আলোচনায় তাদের অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে।
লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ নিয়ে উদ্বেগ
সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি দিক হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথ। লোহিত সাগর দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। হুথিরা সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে।
ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় লোহিত সাগরের বিকল্প রুটের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুথিদের প্রভাব সৌদি আরবের জন্য শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্বেগও তৈরি করেছে।
সৌদি আরব হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন উপকূলীয় অঞ্চল পুনর্দখলে ইয়েমেনি বাহিনীকে সামনে রেখে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। এতে সৌদি বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা থাকার কথা বলা হয়। তবে অভিযানের সাফল্য নির্ভর করবে ইয়েমেনি সরকারপন্থী বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয় ও সামরিক সক্ষমতার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা
সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। শনিবারের হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। এর আগে সৌদি যুবরাজের সরাসরি সামরিক সহায়তার অনুরোধে ওয়াশিংটন সাড়া দেয়নি। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালালেও সেই অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি কৌশল নির্ধারণ করা, যাতে হুথিদের হামলা ঠেকানো যায়, কিন্তু নতুন করে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে না হয়। হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ও দীর্ঘ সংঘাতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান অর্জন কঠিন হতে পারে।
ইয়েমেনের সংঘাত তাই আবারও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপ শুধু দেশটির নিজস্ব নিরাপত্তাই নয়, লোহিত সাগরকেন্দ্রিক বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করতে পারে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক প্রতিবেদন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


