আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ইরানের প্রেসিডেন্ট কেন দুঃখপ্রকাশ করলেন?

আমার দেশ অনলাইন

প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ইরানের প্রেসিডেন্ট কেন দুঃখপ্রকাশ করলেন?

তেহরান প্রতিবেশী যেসব দেশে হামলা চালিয়েছে, সেই দেশগুলোর কাছে ইরানের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শনিবার যখন দুঃখপ্রকাশ করেন, তখন অনেকেই অবাক হয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এক রাষ্ট্রের আরেক রাষ্ট্রের কাছে দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি, বিশেষ করে চলমান কােনো সংঘাতের সময়, বেশ বিরল এবং এ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ হয় উল্লেখযােগ্য। নেতৃবৃন্দ সাধারণত 'দুঃখপ্রকাশ' করেন অথবা কােনো ঘটনা থেকে দায়িত্ব এড়িয়ে যান।

কিন্তু এখন ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলাের টার্গেটে পরিণত হওয়ার দায়িত্ব সরাসরি স্বীকার করে নিয়েছেন পেজেশকিয়ান, এবং বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে 'প্রথমে হামলা না হলে' ইরানও তাদের ওপর হামলা করবে না।

তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি যে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আক্রমণ করা হয়েছে, তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশগুলোতে আক্রমণ করার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই।’

এখন এর ফলে প্রথম যে প্রশ্ন উঠছে, সেটি হচ্ছে - এটি কি সত্যিকারের 'দুঃখপ্রকাশ' ছিল এবং এখন কেন?

একটি সম্ভাবনা হতে পারে, ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন।

শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।

পেজেশকিয়ান বলেন, প্রাথমিক হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার নিহত হওয়া এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামো ব্যাহত হওয়ার পর 'ইচ্ছামতাে' এসব হামলা চালানো হয়েছিল।

দুঃখপ্রকাশ করে পেজেশকিয়ান হয়ত এমন বার্তা দিতে চাইছেন যে, তেহরান আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে চায় না।

তবে এই বার্তা পরোক্ষভাবে এক রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও স্বীকার করে নেয়া যে, যদিও কিছু প্রতিবেশী দেশ তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত ঘাঁটি থেকে মার্কিন বাহিনীকে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে, তবুও ইরান যদি তাদের টার্গেট করে তাহলে তারা নিজেদের আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলার ঝুঁকিতে পড়বে।

কিন্তু দুঃখপ্রকাশ করা বা ক্ষমা চাওয়া শেষ পর্যন্ত নীতিতে পরিণত হবে কী-না তা ঠিক স্পষ্ট নয়।

ওই অঞ্চল থেকে আসা প্রতিবেদনগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান বা তার বাহিনীর সাথে সম্পর্কিত হামলা এখনও বন্ধ হয়নি। কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত উভয়ই শনিবার জানিয়েছে যে তারা তাদের লক্ষ্য করে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।

যদি এ ধরণের হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে এটি ইরানের ভেঙ্গে পড়া নেতৃত্ব কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করবে।

যেহেতু প্রথম পর্যায়ের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরা নিহত হয়েছেন, ফলে এখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে।

সাদা চোখে মনে হতে পারে, এ কাঠামোতে আগে যেখানে একজন সর্বোচ্চ নেতা চালিত ব্যবস্থায় পেজেশকিয়ানের মতো ব্যক্তিত্বদের যে ক্ষমতা বা প্রভাব ছিল তার চাইতে তাদের প্রভাব বেড়েছে।

কিন্তু বাস্তবে, বিপ্লবী গার্ডের মতো শক্তিশালী সামরিক এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারের কতটা রয়েছে - তা এখনাে নিশ্চিত নয়।

প্রেসিডেন্টের শনিবারের বক্তব্যের পরেও যদি প্রতিবেশী দেশগুলোয় ইরান-সম্পর্কিত হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে এর অর্থ হবে- হয় প্রতিবেশীদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে অথবা সংঘাত কমাতে চায়, এমন গোষ্ঠীর সাথে নেতৃত্বের বিরোধ অবধারিত হয়ে উঠবে।

ইরানের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কট্টরপন্থী অংশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তি দিয়ে আসছে যে, এই আঞ্চলিক চাপই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ইরানের শক্তিশালী সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে আসছে।

প্রেসিডেন্টের বক্তব্য নিয়ে দেশটির ভেতরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইতিমধ্যে ইরানের কট্টরপন্থীদের কয়েকটি অংশ পেজেশকিয়ানের মন্তব্যকে দুর্বল বলে সমালোচনা করেছেন।

ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক মুহূর্তটি বেশ অস্বাভাবিক, কারণ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা বেশ কয়েকজন কট্টরপন্থী ব্যক্তিত্ব নিহত হয়েছেন, কিন্তু অনেক নিম্ন-পদস্থ কর্মকর্তা এবং কমান্ডার এখনও যেকোনও সমঝোতার বার্তার ব্যাপারে গভীর সন্দেহ পোষণ করেন।

তাদের মতে, প্রতিবেশী সরকারের কাছে দুঃখপ্রকাশ করাটা একটি জাতীয় সংকটের মূহুর্তে আত্মসমর্পণ হিসাবে দেখার ঝুঁকি রয়েছে।

ইরানের বাইরে, পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হয়েছে একেবারেই ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন যে, ইরান তার প্রতিবেশীদের কাছে "ক্ষমা চেয়েছে এবং আত্মসমর্পণ করেছে"।

তিনি যুক্তি দিয়েছেন, এ পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি সামরিক চাপ কাজ করছে।

তার বক্তব্যের ভাষায় বােঝা যায় যে ওয়াশিংটন তেহরানের বার্তাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে। মি. ট্রাম্প বারবার জোর দিয়ে বলে আসছেন যে, এ যুদ্ধের একমাত্র গ্রহণযোগ্য ফলাফল হল ইরানের 'সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ'।

তার ওই দাবি স্বাভাবিকভাবেই একটি কূটনৈতিক বিরোধের জন্ম দেয়।

ঐতিহাসিকভাবে, কোন দেশই সাধারণত কেবল বিমান অভিযানের ফলে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে না, তাতে বোমা হামলা যত তীব্রই হোক না কেন।

স্থল বাহিনীর অভিযান ছাড়া, এ ধরনের ফলাফল পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

পেজেশকিয়ানের দুঃখপ্রকাশকে তাই আত্মসমর্পণের একটি রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি রাজনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে - মানে ইরানের আত্মসমর্পণের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ না করেও ওয়াশিংটন যুদ্ধে নিজের অগ্রগতি দাবি করতে পারে।

কিন্তু পেজেশকিয়ান এবং ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদের জন্য, হিসাবটা হতে পারে ভিন্ন।

নতুন একজন স্থায়ী নেতা নির্বাচনের আগে যদি এখন যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো যায়, তাহলে সেটি পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে পারে।

ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা যদি একজন কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা হন, তাহলে কূটনীতির সম্ভাবনা আরও সংকুচিত হয়ে যাবে।

এ সম্ভাবনার ফলে আরেকটি কৌশলগত প্রশ্ন উত্থাপন হয় - পেজেশকিয়ান কি নিজেকে উদারপন্থী একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, ঠিক যে ধরণের একজন নেতার সাথে পশ্চিমা সরকারসমূহ কাজ করতে পছন্দ করবে?

তার বক্তব্যে, তিনি অনমনীয়তা এবং উদারতার একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, একদিকে তিনি আত্মসমর্পণ প্রত্যাখ্যান করেছেন, আবার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির প্রতি সংযত প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এদিকে, ইরানের ভবিষ্যত নেতৃত্ব নিয়ে ইতিমধ্যেই একধরনের লড়াই শুরু হয়েছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সাথে ইরানের বিপ্লবী গার্ড আইআরজিসি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ডারদের অনেকেই বর্তমান সংকটকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার একটা সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

কেউ কেউ অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টকে পরবর্তী নেতা নির্বাচনের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

এখন যদি পেজেশকিয়ান দ্রুত স্থিতিশীলতা আনতে না পারেন, কিংবা সশস্ত্র বাহিনীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা হয়ত যুক্তি দেবেন যে তাদের আরও কঠোর নেতা নির্বাচন করতে হবে।

তবে, এখনকার মত যোগ্যতার পরিমাপক পরীক্ষার স্থান ইরান সীমান্তের বাইরে।

এখন পর্যন্ত, ইরানের প্রতিবেশীদের কেউ কেউ সতর্কতার সাথে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, বা নীরব রয়েছে, হয়ত দুঃখপ্রকাশের পর বাস্তবে কোন পরিবর্তন আসে কী-না তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে।

এদিকে, ইসরায়েল যে এ যুদ্ধকে ইরানের দীর্ঘমেয়াদী হুমকি দুর্বল করার একটি বিরল সুযোগ হিসেবে দেখছে, সে পেজেসকিয়ানের বক্তব্যকে উত্তেজনা হ্রাসের প্রকৃত পদক্ষেপ বলে মনে করে না।

ফলে ধারণা করা যায়, পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের অস্পষ্টতা হয়ত ইচ্ছাকৃত।

আর তার দুঃখপ্রকাশ করাটা অনেকগুলো ব্যাখ্যার সুযােগ তৈরি করে দেয় - আঞ্চলিক পর্যায়ে উত্তেজনা প্রশমণের একটি চেষ্টা, বা ইরানের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য কিছুটা সময় বের করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, অথবা তেহরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা সংকেত।

কিংবা হয়ত এই তিন সম্ভাবনার সমষ্টিই হচ্ছে পেজেসকিয়ানের বক্তব্যের মূলকথা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন