আমিরাতের সঙ্গে প্রতিবেশীদের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে কেন

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

আমিরাতের সঙ্গে প্রতিবেশীদের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে কেন
প্রতীকী ছবি

সৌদি আরবের পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে দ্বিতীয় জনবহুল দেশ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে দেশটির ১১ মিলিয়নের ( এক কোটি ১০ লাখ) বেশি জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশি এবং বিদেশিদের একটি বড় এসেছে অংশই ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে।

দেশটিতে প্রায় ২০০টি ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ রয়েছে যাদের বেশিরভাগই কাজের জন্য এসেছে। এদের মধ্যে শুধু ভারতীয়রাই দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

এর বিপরীতে, ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমিরাতি নাগরিকত্বধারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ ১০ হাজার। পুরো দেশে পুরুষের হার ৬৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং নারীর হার ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। পরিবারের সঙ্গে আসতে না পারা বিপুল সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিকের উপস্থিতির কারণেই এই ভারসাম্যহীনতা দেখা গেছে।

অর্থনীতির আকার ও প্রবৃদ্ধির পরিমাপক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জিডিপি প্রায় ৫০৪ বিলিয়ন ডলার (যুক্তরাজ্যে এটি প্রায় ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার)। মাথাপিছু জিডিপি বা ক্রয়ক্ষমতা সমতা হিসেবে এটি প্রায় ৫৩ হাজার ডলার (যুক্তরাজ্যে প্রায় ৪৮ হাজার ৯০০ ডলার)।

আমিরাতের অর্থনীতি মূলত তেলের ওপর নির্ভরশীল। দেশের জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ এবং সরকারি রাজস্বের ৪১ শতাংশ আসে তেল থেকে। দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ৩ কোটি ৮৩ লাখ ব্যারেল, এবং প্রমাণিত তেল মজুতের পরিমাণ আনুমানিক ১১৩ বিলিয়ন ব্যারেল।

আব্রাহাম চুক্তি

সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ২০২০ সালে একসঙ্গে 'আব্রাহাম চুক্তি' সই করে ইসরেইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয়।

আমিরাত জানায়, এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ‘ইসরাইলের পশ্চিম তীর দখল ঠেকানো এবং ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলের মধ্যে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান রক্ষা করা।’

২০২২ সালে ইসরাইলের সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক আরো জোরদার হয়। তেলবহির্ভূত বাণিজ্য ২০২০ সালের ১৬০ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন (২৩০ কোটি) ডলারে। এই বাণিজ্যের মধ্যে ছিল মূল্যবান পাথর, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও গাড়ি।

গাজা যুদ্ধে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলের বসতিতে হামাসের হামলাকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ‘একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা’ হিসেবে নিন্দা জানায় এবং ‘অবিলম্বে ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির’ আহ্বান করে।

একই সময়ে, ইসরাইলের সঙ্গে আমিরাতের বাণিজ্যও অব্যাহত থাকে এবং ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক

২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদি আরব, বাহরাইন ও মিসরের সঙ্গে মিলে সংযুক্ত আরব আমিরাত কাতারের ওপর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞায় অংশ নেয়। এসব দেশ কাতারকে ‘সন্ত্রাসবাদে সমর্থন ও অর্থায়ন’ এবং ‘ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের’ অভিযোগ করেছিল।

ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন তিনটি দ্বীপ- আবু মুসা, গ্রেটার তুনব ও লেসার তুনবকে নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড বলে দাবি করে আমিরাত।

হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত হওয়ায় এসব দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সামুদ্রিক তেল বাণিজ্য, পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও রাসায়নিক সার পরিবাহিত হয়।

তবে বাস্তবে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য যেকোনো আরব দেশের চেয়ে ইরানের সঙ্গে আমিরাতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেশি। ইরানের শুল্ক প্রশাসনের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, চীনের পর ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত।

২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দুই দেশের বাণিজ্য ১১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তুলনামূলকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমিরাতের বাণিজ্য ২০১২ সালেও ২২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি।

২০১৬ সালে তেহরানে সৌদি দূতাবাসে হামলার পর রিয়াদ ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে আমিরাতও কূটনৈতিক সম্পর্ক কমিয়ে আনে। তবে ২০১৯ সালের পর থেকে দুই দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আবার সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফিরে এসেছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরবও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় শুরু করে।

ইয়েমেনের ভাড়াটে সেনা

সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে যোগ দিয়ে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। হুথিদের ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে আমিরাত, যেগুলো তেহরান সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১৯ সালে আবুধাবি ঘোষণা দেয়, তারা ‘ইয়েমেন থেকে তাদের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করেছে’, তবে একই সঙ্গে জানায় ‘সন্ত্রাসবাদের’ বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে তারা বিশেষ বাহিনী রেখে দেবে। এর ফলে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে আমিরাত আর জড়িত থাকবে না বলেই মনে হচ্ছিল।

তবে বিবিসির একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড পরিচালনায় আমিরাত মার্কিন ভাড়াটে সেনা ব্যবহার করেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই ছিল সুন্নি ইসলামপন্থি সংগঠন ইসলাহ পার্টির নেতাদের লক্ষ্য করে। তাদের আবুধাবির শাসক পরিবারের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়।

আমিরাত ইয়েমেনে বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং বলে, তাদের অভিযান শুধু আল-কায়েদা ও তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) লক্ষ্য করে। তবে বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আবুধাবি ইয়েমেনে নিজের নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে সাবেক আল-কায়েদা ও আইএস সদস্যদেরও নিয়োগ দিয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মুকাল্লায় একটি চালান লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যা ‘আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য অস্ত্র’ বহন করছিল বলে দাবি করা হয়।

আবুধাবি অস্ত্র পাঠানোর কথা অস্বীকার করে এবং সৌদি অভিযোগের বিষয়ে ‘গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করে।

সৌদি আরব আরো অভিযোগ করে, আমিরাত হাদরামাউত ও আল-মাহরা প্রদেশে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে দক্ষিণ ইয়েমেনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় ‘উসকানি’ দিয়েছে।

রিয়াদ একে সৌদি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ‘হুমকি’ বলে আখ্যা দেয় এবং সতর্ক করে এসব ‘বিপজ্জনক পদক্ষেপের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এরপর আমিরাত ঘোষণা দেয় তারা ‘ইয়েমেনে তাদের কার্যক্রম শেষ করবে’, যদিও সৌদি বিমান হামলা ও হুমকির বিষয়ে সরাসরি কোনো উল্লেখ করেনি।

চলতি বছরের শুরুতে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার অভিযোগ করে, মুকাল্লা শহরে একটি গোপন কারাগার পরিচালনা করেছে আমিরাত।

হাদরামাউতের গভর্নর সালেম খানবাশি দোষীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন।

বাশার আল-আসাদের সঙ্গে দূরত্বের কমানো

আরব লীগ ২০১১ সালে সিরিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করে এবং বাশার আল-আসাদ সরকারকে সশস্ত্র বিরোধীদের সঙ্গে সংঘাতে "বেসামরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার" আহ্বান জানায়। সৌদি আরব ও কাতার অন্য অনেক আরব দেশের তুলনায় বেশি জোরালোভাবে আসাদকে বয়কট ও একঘরে রাখার পক্ষে ছিল এবং প্রকাশ্যে তার পদত্যাগ দাবি করেছিল।

২০১৪ সালে দুবাইয়ের শাসক ও আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুম বাশার আল-আসাদকে বলেন, ‘আপনি যদি নিজের জনগণকে হত্যা করেন, তাহলে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না; একদিন আপনাকে যেতে হবেই।’

তবে ২০১৮ সালে আমিরাত দামেস্কে তাদের দূতাবাস পুনরায় খুলে দেয়। ২০২০ সালের মার্চে তৎকালীন কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান কোভিড মহামারি মোকাবিলায় সহযোগিতার প্রস্তুতির কথা জানিয়ে আসাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এরপর ২০২১ সালের অক্টোবরে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। এক মাস পর আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান দামেস্ক সফর করে বাশার আল-আসাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনিই ২০১১ সালে সিরিয়া যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবার কোনো আরব দেশে আসাদের সফরের পথ সুগম করেন; ২০২২ সালের ১৮ মার্চ সেই সফরটি হয় আমিরাতে।

২০২৩ সালের মে মাসে সিরিয়া আরব লীগে ফিরলে একঘরে অবস্থার অবসানে আমিরাতের ভূমিকা অব্যাহত ছিল। ২০১১ সালের আগ পর্যন্ত হামাসের সঙ্গে বাশার আল-আসাদের সম্পর্ক এবং হেজবুল্লাহর সঙ্গে তার জোট, যাকে গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেখে, এই প্রক্রিয়াকে থামাতে পারেনি।

রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে বলা হয়, বাশার আল-আসাদ ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ার সময় তার জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ইয়াসর ইব্রাহিম একটি ব্যক্তিগত বিমান ভাড়ার করার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেটায় করে আসাদ, তার পরিবারের সদস্য, সহকারীরা ও প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসের কর্মীদের মূল্যবান সামগ্রী আমিরাতে পাঠানো হয়।

রয়টার্স জানায়, এসব সামগ্রী চারটি পৃথক ফ্লাইটে পরিবহন করা হয়েছিল এবং প্রতিবেদনে ডজনখানেক সূত্রের তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে।

লিবিয়ায় খলিফা হাফতারের ওপর বাজি

২০১১ সালে লিবিয়ার নেতা মুআম্মার গাদ্দাফির মৃত্যুর পর দেশটি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই ক্ষমতার লড়াইয়ে নির্দিষ্ট পক্ষকে সমর্থন দিতে হস্তক্ষেপকারী দেশগুলোর মধ্যে আমিরাতও ছিল।

২০১৪ সালের আগস্টে, মিসরের ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা আমিরাতি যুদ্ধবিমান বেনগাজি বিমানবন্দরে লিবিয়া ডন বাহিনীর অবস্থানে বোমা হামলা চালায়। ইসলামপন্থি আন্দোলন সমর্থিত লিবিয়া ডন বাহিনী তখন খলিফা হাফতারের বাহিনীর সঙ্গে লড়ছিল, যাকে সমর্থন দিচ্ছিল আমিরাত, ফ্রান্স ও রাশিয়া।

বিবিসির একটি অনুসন্ধানে জানানো হয়, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আমিরাতের পাঠানো ড্রোন হামলায় লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির একটি সামরিক একাডেমিতে ২৬ জন শিক্ষার্থী নিহত হন।

তখন ত্রিপোলি খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির অবরোধের মধ্যে ছিল।

এর আগে আমিরাত লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এবং জাতিসংঘ-নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রক্রিয়াকে সমর্থনের কথা বলেছিল।

সুদানের গৃহযুদ্ধ

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সুদানের 'র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস'-এর সঙ্গে যুক্ত হাজারো সেনাকে প্রশিক্ষণ দিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি সামরিক কেন্দ্র স্থাপন করেছে।

ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যামের কাছে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি আমিরাতের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

আটটি ভিন্ন সূত্র, উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ ও ফাঁস হওয়া কূটনৈতিক নথির ভিত্তিতে তৈরি রয়টোর্সের ওই প্রতিবেদনে র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সমর্থনে আমিরাতের সামরিক সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে আবুধাবি সুদানের যুদ্ধে কোনো ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছে। সুদান সরকার গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে আমিরাতের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

খার্তুমের দাবি, পশ্চিম দারফুরে মাসালিত জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে আমিরাত অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সহায়তা করছে।

আমিরাত এসব অভিযোগকে ‘প্রচারণামূলক নাটক" আখ্যা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও এখতিয়ার না থাকায় মামলাটি খারিজ করে দেয়, কারণ গণহত্যা সনদের ৯ নম্বর ধারা লঙ্ঘনের দায়ে আমিরাতের বিচার করা সম্ভব নয়।

সোমালিয়া ও ইসরাইল

সোমালি সরকার জানুয়ারির মাঝামাঝি ঘোষণা দেয় তারা আমিরাতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও বন্দর ব্যবস্থাপনা চুক্তি বাতিল করেছে। টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ আবুধাবিকে তার দেশের ‘সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা লঙ্ঘনের’ অভিযোগ করেন।

এই অবস্থান আসে ইসরাইলের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে, যেখানে তারা সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যাকে সোমালি ফেডারেল সরকার তাদের ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’ হিসেবে দেখে।

অনেক সোমালির বিশ্বাস, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের এ সিদ্ধান্তে আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

গত ডিসেম্বর ইসরাইলই প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতা স্বীকৃতি দেয়। এর বিনিময়ে অঞ্চলটির কর্মকর্তারা আব্রাহাম চুক্তিতে সই করা এবং ইসরাইল, আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও পরে সুদানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ঘোষণা দেন।

বাস্তবে, সোমালিয়ার ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নিয়ে আমিরাতের ‘সন্দেহজনক ভূমিকা’ সম্পর্কে সরকারের আশঙ্কা ২০২৪ সাল থেকেই।

অনেক সোমালি মনে করেন, সোমালিল্যান্ড ও ইথিওপিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকে আবুধাবি সমর্থন দিয়েছিল, যার বিরোধিতা করেছিল মোগাদিশুর কেন্দ্রীয় সরকার।

ওই চুক্তির আওতায়, আমিরাতের মিত্র ইথিওপিয়াকে সোমালিল্যান্ড উপকূলে নৌঘাঁটি স্থাপন করে বাণিজ্যিক কাজে বেরবেরা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। বিনিময়ে আদ্দিস আবাবা সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতা স্বীকৃতি দেয়, যা আগে ইসরাইলও করেছিল।

সোমালি ফেডারেল সরকার আরো অভিযোগ করে, ইয়েমেনি বিচ্ছিন্নতাবাদী আইদারোস জুবাইদিকে ‘চোরাচালানের’ মাধ্যমে তাদের আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে আমিরাত। সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের এই প্রধান প্রথমে বেরবেরা বন্দরে জাহাজে পৌঁছে, পরে আবুধাবিতে উড়ে যান বলে জানা যায়।

আলজেরিয়ার সঙ্গে বাড়তে থাকা সংকট

আলজেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদেলআজিজ বৌতেফলিকা, যিনি ‘আমিরাতের বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তার পদত্যাগের পর আলজেরিয়া ও আমিরাতের মধ্যে বিরোধ আবারো তীব্র হয়।

প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুনে আলজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলার পর আলজেরিয়া আবুধাবির সঙ্গে বিমান চলাচল চুক্তি বাতিল করে।

দুটি দেশের সম্পর্ক আরো চাপে পড়ে আলজেরিয়ার কাছে সংবেদনশীল কয়েকটি বিষয়ে আমিরাতের ভূমিকার কারণে। এর মধ্যে লিবিয়ার দক্ষিণে, আলজেরিয়া সীমান্তের কাছে খলিফা হাফতারকে সমর্থন এবং আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোতে আমিরাতের প্রকল্প ও তাদের সঙ্গে সম্পর্কে বিষয়টি রয়েছে।

আলজেরিয়া আরো মনে করে, আমিরাত মরক্কো ও ইসরাইলের সঙ্গে মিলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন মুভমেন্ট ফরে সেল্ফ ডিটারমিনেশান বা এমএকে- কে ‘অর্থায়ন ও সমর্থন’ দিচ্ছে; এই গোষ্ঠী আলজেরিয়ার এক আদিবাসী অঞ্চলের স্বাধীনতা চায়।

আলজেরীয় কর্তৃপক্ষ, যাদের নেতারা ফ্রান্সে থাকেন, তাদের ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে।

নরম কূটনীতি থেকে 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ'

১৯৭১ সালে শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিষ্ঠার পর দেশটি আরব দেশ, উপসাগরীয় প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও উষ্ণ সম্পর্কের জন্য পরিচিত ছিল। ১৯৮১ সালে আবুধাবিতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ প্রতিষ্ঠা হয়, যেখানে শেখ জায়েদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

আমিরাতের প্রথম প্রেসিডেন্ট আরব দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও ঘনিষ্ঠতা আনতে বহু উদ্যোগ নেন। ১৯৮০ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধ অবসানে আরব লীগ বৈঠকের আহ্বান জানান।

কুয়েত দখলের সময় তিনি ছিলেন সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা প্রথম দিকের আরব নেতাদের একজন।

১৯৯৪ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরুর পর সংঘাতরত পক্ষগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেন এবং ১৯৮৭ সালের আম্মান সম্মেলনে মিসরের আরব লীগে ফেরার আহ্বান জানান।

শেখ জায়েদের সময়ে আরব বিশ্ব, ইসলামি দেশ ও বিশ্বের অন্য অঞ্চলে দাতব্য প্রকল্প ও মানবিক সহায়তায় অংশ নিতে আমিরাত তাদের আর্থিক সক্ষমতা ব্যবহার করে। মিসর, মরক্কো, সুদান, গিনি, মৌরিতানিয়া ও কসোভোর মতো দেশে হাসপাতাল, স্কুল, ঘরবাড়ি ও এতিমখানা নির্মিত হয়।

তবে ২০১১ সাল থেকে গোটা অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া 'আরব বসন্ত', যা একাধিক সরকারের পতন ঘটায়, আমিরাতের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নীতিতে এক বড় মোড় এনে দেয়। মিসর, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন ও তুরস্কে ইসলামপন্থি ও মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থানকে আবুধাবি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি রাজধানী শাসক ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছে।

মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের পর আমিরাত ও মিসরের সম্পর্ক খারাপ হয়। তখন আমিরাত ও সৌদি আরব একসঙ্গে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির নেতৃত্বে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানে সমর্থন দেয়।

ইসলামপন্থিদের উত্থান উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও বিভাজন তৈরি করে। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড উৎখাতে আমিরাত ও সৌদি আরব সমর্থন দিলেও কাতার তাদের পাশে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে সৌদি আরব ও কাতার সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধীদের সমর্থন করে।

২০১৪ সালে তৎকালীন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট খলিফা বিন জায়েদ স্ট্রোক করেন, যার ফলে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা কমে যায়। এরপর থেকে তার সৎভাই মোহাম্মদ বিন জায়েদ কার্যত দেশ পরিচালনা করেন, ২০২২ সালে যিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট হন।

'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ'

২০১৭ সালে জেনেভায় বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদ ইউরোপীয় নেতাদের ইসলামপন্থিদের প্রতি ‘সহনশীলতার’ সমালোচনা করেন এবং সতর্ক করে দেন আগামী বছরগুলোতে ইউরোপ ইসলামি চরমপন্থিদের ঢেউয়ের মুখোমুখি হবে।

তিনি ইউরোপীয় নেতাদের বলেন, ‘একদিন আসবে, যখন সংশয় ও সহনশীলতার কারণে আমরা ইউরোপ থেকেই আরো বেশি চরমপন্থি ও সন্ত্রাসীর উত্থান দেখব। কারণ ইউরোপীয়রা মনে করে তারা মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলাম আমাদের চেয়ে ভালো বোঝে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এটি এক গভীর অজ্ঞতা।’

ফ্রান্সে বামপন্থি দল ফ্রান্স ইনসুমিসের নেতা জঁ-লুক মেলেঁশঁ মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব নিয়ে ফরাসি সরকার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে একটি প্রতিবেদন অর্থায়নের অভিযোগ এনে আমিরাতকে অভিযুক্ত করেন। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ফরাসি পার্লামেন্ট তদন্ত শুরু করে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন