হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়ে ইরান ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করছে তেহরানের এমন দাবির পর ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে উপসাগরীয় দেশ ওমান।
বিতর্কিত এই সমুদ্রপথের দক্ষিণে ওমানের ছিটমহল মুসান্দাম অবস্থিত। সাধারণত বিশ্বের সমুদ্রবাহিত তেল চলাচলের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে হয়ে থাকে। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি হামলার পর থেকে গত ১০ সপ্তাহ ধরে এই সমুদ্রপথটি অবরুদ্ধ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলেছে, ইরানকে কোনো ধরনের টোল বা শুল্ক দেওয়ার শর্তযুক্ত কোনো স্থায়ী সমাধান এই অবরোধের ক্ষেত্রে মেনে নেওয়া হবে না।
ওয়াশিংটনের দাবি, ওমানও একই মনোভাব পোষণ করে।
গত শুক্রবার ভারতে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হরমুজ প্রণালিকে একচেটিয়াভাবে ওমান ও ইরানের জলপথ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই প্রণালিটি ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমায় অবস্থিত। এর মাঝে কোনো আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা নেই।’
আরাগচি আরো জানান, প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ইরান ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করছে। তবে এই সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচলকারী সমস্ত জাহাজের জাতীয়তার বিবরণ চাওয়া এবং ফি বা শুল্ক আদায়ের ইরানি পরিকল্পনার বিষয়ে ওমান এখন পর্যন্ত নীরব রয়েছে।
পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, প্রণালির ভবিষ্যৎ স্থায়ী ব্যবস্থাপনার জন্য ইরানের এই প্রস্তাবগুলো বেআইনি। কারণ এগুলো বাণিজ্যিক শিপিংয়ের ওপর শুল্ক আরোপ করে এবং মালিকানার জাতীয়তার ওপর ভিত্তি করে ইরানকে খেয়ালখুশিমতো জাহাজ বাছাই করার অধিকার দেয়। এ ছাড়া সেবামূল্যের জন্য প্রতিটি জাহাজকে একটি ‘রিয়াল অ্যাকাউন্ট’ খোলার বাধ্যবাধকতা সম্ভবত জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থি হবে, যা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অর্থ পাঠানো নিষিদ্ধ করে।
অন্যদিকে, নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের তৈরি একটি প্রতিদ্বন্দ্বী পরিকল্পনা ওমানের কাছে পেশ করা হয়েছে, যা বেশিরভাগ উপসাগরীয় দেশের সমর্থন পেয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক পরিচালক লর্ড লেভেলিন এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের সেক্রেটারি জেনারেল আর্সেনিও ডমিঙ্গোয়েজ মাসকাট সফর করেছেন।
প্রণালিটি পুনরায় চালু করার অচলাবস্থার মূলে রয়েছে উপকূলীয় দেশগুলোর শুল্ক আরোপের আইনি অধিকারের বিষয়টি। ১৯৮২ সালে জাতিসংঘ সমুদ্র আইন চুক্তিতে ইরান স্বাক্ষর করলেও তা কখনো অনুমোদন করেনি। ফলে ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে তারা ট্রানজিট পাসের নিয়ম দ্বারা বাধ্য নয়, বরং প্রথাবদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন বা ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ (নিরীহ চলাচল) নিয়ম দ্বারা পরিচালিত।
তেহরানের দাবি, চুক্তি মানলেও উপকূলীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর কোনো হুমকি বা বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে এই চলাচল সীমিত করা যেতে পারে। ইরানের অভিযোগ, যুদ্ধের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ (ইউএই) প্রণালির দক্ষিণ তীরকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘাঁটিতে অস্ত্র জুগিয়েছে।
ইরান আশা করছে, গত ৫ মে তাদের প্রতিষ্ঠিত ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ (পিজিএসএ) একটি লাভজনক রাজস্ব আয়ের উৎস হবে।
পিজিএসএ জানিয়েছে, জাহাজগুলোকে এখন থেকে ইমেইলের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে এবং প্রতি ব্যারেলে প্রায় এক ডলার সমপরিমাণ ইরানি মুদ্রায় ফি দিতে হবে।
বেইজিংয়ে এক সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীন এই প্রণালি দিয়ে ইরানের প্রায় ৪৫ শতাংশ তেল আমদানি করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একমত হয়েছে যেকোনো শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা থাকবে না।
তবে আইআরজিসি গত বৃহস্পতিবার জানায়, ইরানে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনার পর একদল চীনা তেল ট্যাংকারকে তেহরান প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে এবং এই জাহাজগুলো ইরানি শাসনব্যবস্থার শর্ত মেনে চলতে সম্মত হয়েছে। অবশ্য চীন কোনো ফি দিয়েছে কি-না তা প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের নেওয়া সমস্ত পদক্ষেপ সার্বভৌমত্ব, বেসামরিক নাগরিক এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার অংশ ছিল।
গত সোমবার ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল এপ্রিলের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের ওপর সামরিক অভিযান চালিয়েছিল।
এই খবরের পর যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের আরো স্পষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে আমিরাতের বিবৃতিতে ইরানের ওপর হামলার রিপোর্টের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলা হয়নি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


