‘আমার জীবনও ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছে’Ñপরিবারের ১২ সদস্য হারানো ইরানি যুবক

‘আমার জীবনও ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছে’Ñপরিবারের ১২ সদস্য হারানো ইরানি যুবক

তেহরানে আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় স্ত্রী, মা-বাবা, দাদা-দাদি ও স্বজনসহ পরিবারের ১২ সদস্যকে হারিয়েছেন ইরানের নাগরিক হামেদ মির্জাই। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে তার শৈশব, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। বিয়ের মাত্র এক বছর পর স্ত্রীকে নিয়ে নতুন সংসার ও সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু মুহূর্তের এক হামলায় সবকিছু হারিয়ে এখন নিজেকে সম্পূর্ণ একা মনে করছেন এই যুবক।

বিজ্ঞাপন

আল জাজিরায় প্রকাশিত নিজের অভিজ্ঞতাভিত্তিক এক বর্ণনায় হামেদ জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ৯ মার্চ তেহরানে তাদের আবাসিক ভবনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় পরিবারের ১২ সদস্য নিহত হন। হামলার সাত মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিদিন ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির কাছে ফিরে যান তিনি। স্বজনদের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে এখনো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজের হারিয়ে যাওয়া জীবনের কোনো চিহ্ন খুঁজে ফেরেন। হামেদের ভাষায়, আমার মনে হয়, আমার জীবনটা এখানেই চাপা পড়ে আছে। প্রতিদিন এখানে ফিরে আসি, যদি জীবনের কোনো অংশ খুঁজে পাই। কিন্তু আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

হামেদ জানান, যে ভবনটিতে তাদের পরিবার বসবাস করত, সেটি তার দাদা ও বাবার চাচা মিলে নির্মাণ করেছিলেন। পরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভবনের বিভিন্ন ফ্ল্যাট ভাগ করে দেওয়া হয়। এক বছর আগে বিয়ের পর স্ত্রী ২৬ বছর বয়সী মোহাদ্দেসেকে নিয়ে সেই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস শুরু করেন তিনি। তরুণ এই দম্পতি তখন নতুন সংসার গোছানোর পাশাপাশি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। সামনে ছিল অনেক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। কিন্তু ৯ মার্চ সোমবার দুপুরে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে যায়।

হামেদ জানান, সেদিন দুপুর ১টার দিকে তিনি কর্মস্থলে খোঁজ নিতে বাড়ি থেকে বের হন। বেলা আড়াইটার দিকে স্ত্রী মোহাদ্দেসে তাঁকে বার্তা পাঠিয়ে ফেরার পথে মাথাব্যথার ওষুধ কিনে আনতে বলেন। কোন ওষুধ প্রয়োজন, তা জানতে স্ত্রীকে ফোন করেন তিনি। কিন্তু ফোন ব্যস্ত থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

বাড়িতে অতিথি আসার কথা থাকায় অতিথির ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন। সেটিও ব্যস্ত পান। পরে আবার স্ত্রীকে ফোন করার কথা ভাবেন তিনি। বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে থাকতেই হঠাৎ ক্ষেপণাস্ত্রের শিস দেওয়ার শব্দ শুনতে পান হামেদ। এর পরপরই প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ ও ধাক্কায় কেঁপে ওঠে মাটি। তিনি আবার স্ত্রীকে ফোন করেন। কিন্তু ফোন বন্ধ পান। এরপর একে একে বাবা, মা, দাদা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কারও ফোনেই পাওয়া যাচ্ছিল না।

তবু তার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে নিজেদের বাড়িটিই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। বারবার নিজেকে বোঝাচ্ছিলেন, তাদের বাড়িতে হামলা হওয়া অসম্ভব। হয়তো আশপাশের অন্য কোথাও ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে তাদের বাড়িতে আরো পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। বাড়ির কাছে পৌঁছে হামেদ দেখেন, পুরো ভবনটি ধ্বংস হয়ে গেছে। একসময় যেখানে তাদের পরিবারের বসবাস ছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে কেবল ভবনের কঙ্কালসার কাঠামো।

তিনি জানান, সবকিছু তখন আগুনে জ্বলছিল। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—দ্বিতীয় তলায় গিয়ে স্ত্রীকে খুঁজে বের করা। কিন্তু বিস্ফোরণে সিঁড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ওপরে যাওয়ার কোনো পথ ছিল না। ভবনের নিচতলার কয়েকজন প্রতিবেশী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন। রেড ক্রিসেন্টের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করেন। হামেদের মনে আশা ছিল, উদ্ধারকারীরা হয়তো তার পরিবারের সদস্যদেরও জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাবেন। কিন্তু প্রথম ঘণ্টায় কাউকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টাতেও কোনো সন্ধান মেলেনি। রাত নামার পরও ভবন থেকে পরিবারের আর কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

হামেদ বলেন, হামলার দিন রাত থেকে শুরু করে পরদিন, তার পরের দিন এবং প্রতিদিন তিনি সেখানে ফিরে গেছেন। টানা ২০ দিন ধ্বংসস্তূপ, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ ও বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়া ধ্বংসাবশেষের মধ্যে স্বজনদের খুঁজেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই পাননি। হামলার ঘটনায় হামেদের স্ত্রী মোহাদ্দেসে, তার শ্যালিকা, বাবা-মা, দাদা-দাদি, ফুফার স্বামী ও মেয়ে, চাচা এবং বাবার চাচাতো ভাই, তার স্ত্রী ও সন্তান নিহত হন। সব মিলিয়ে একই হামলায় পরিবারের ১২ সদস্যকে হারিয়েছেন তিনি।

বিয়ের মাত্র এক বছর আগে যে ভবনে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন, সেই ভবনেই স্ত্রীসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারাতে হয়েছে তাকে। হামেদ বলেন, তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান। ভাই-বোন না থাকলেও বড় যৌথ পরিবারকে ঘিরে তার জীবন ছিল আনন্দময়। সবার সঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত কাটানোর স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু এখন পরিবারের আর কেউ বেঁচে নেই। তার ভাষায়, ‘আমি একাই বেঁচে আছি। আমার পরিবারের আর কেউ নেই। আমি সম্পূর্ণ একা।’

হামেদের ধারণা ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো শোক কিছুটা কমবে, একসময় মানসিক শান্তি ফিরে পাবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। তিনি বলেন, প্রতিদিন স্বজনদের আরও বেশি মনে পড়ে। সময় যত যাচ্ছে, তার কষ্টও তত বাড়ছে। যে ভবনে তার জন্ম, যে ভবনে তার বাবার জন্ম, যে ভবনে নিজের সন্তানের জন্ম হবে বলে স্বপ্ন দেখেছিলেন—একটি হামলায় সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। হামেদ বলেন, ‘আমার বাড়ি ও পরিবার একই সঙ্গে মুছে গেছে। তাঁদের যখন খুব মনে পড়ে, তখন কোথায় যাব, কী দেখব, কিছুই বুঝতে পারি না।’ হামলার সাত মাস পরও প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির কাছে চলে যান তিনি। সেই জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেও পারেন না।

নিজের পরিবারের এই মর্মান্তিক পরিণতিকে যুদ্ধের ভয়াবহতার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন হামেদ। তিনি বলেন, যারা এখনো মনে করেন যুদ্ধের মাধ্যমে ভালো কিছু অর্জন সম্ভব, তাদের তার জীবনের দিকে তাকানো উচিত। যুদ্ধের মধ্যে ভালো কী আছে, সেই প্রশ্ন নিজেদের করা উচিত।

হামেদের ভাষায়, ‘আমার পরিবারের সদস্যদের ধ্বংসস্তূপের নিচে কবর দেওয়া হয়েছে, আর আমি এখনো হেঁটে বেড়াচ্ছি। এ ছাড়া আমাদের মধ্যে আর কোনো পার্থক্য নেই। শুধু মৃতদের তালিকায় আমার নামটি নেই।’ তিনি জানান, জীবনের প্রতিটি কাজই করতেন পরিবারের সদস্যদের সুখী করার জন্য। কিন্তু এখন যাদের জন্য এত কিছু করতেন, তাদের কেউই আর বেঁচে নেই। প্রতিদিন নিজের কাছে প্রশ্ন করেন, কেন এখনো বেঁচে আছেন, কেন জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পান না।

যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ যে শুধু ঘরবাড়ি বা অবকাঠামো ধ্বংস করে না, মানুষের পরিবার, ভবিষ্যৎ ও বেঁচে থাকার স্বপ্নও কেড়ে নেয়—হামেদ মির্জাইয়ের এই অভিজ্ঞতা তারই এক মর্মান্তিক চিত্র।

সূত্র: আল জাজিরা

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন