গাজায় ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরাইলের সামরিক অভিযান বন্ধ এবং বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ২২টি দেশের ১১০টি বন্দরে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন ডক ও বন্দর শ্রমিকরা। পাঁচ মহাদেশের ২৫টিরও বেশি শ্রমিক ইউনিয়নের অংশগ্রহণে ৩০ অক্টোবর শুক্রবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ডক ও বন্দর শ্রমিকদের সংহতি কর্মসূচি। আয়োজকদের দাবি, এই কর্মসূচির মাধ্যমে অস্ত্র পরিবহন ও যুদ্ধের রসদ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করা সম্ভব।
‘ডকওয়ার্কার্স ডু নট ওয়ার্ক ফর ওয়ার’ (বন্দর শ্রমিকরা যুদ্ধের জন্য কাজ করেন না) শীর্ষক এ কর্মসূচির মূল দাবি, ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যার অবসান এবং সব ধরনের সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বন্ধ করা।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মঘটে অংশ নেওয়া বন্দরগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস, তুরস্ক, ভারত, সুইডেন, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো, উরুগুয়ে, মরক্কো, সাইপ্রাসসহ বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের বন্দর শ্রমিকরাও এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
আয়োজকদের তথ্যমতে, অধিকাংশ বন্দরে নিয়মিত কর্মঘণ্টায় ধর্মঘট পালিত হবে। তবে ফ্রান্স, ইতালি, ভারত, গ্রিস ও তুরস্কে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মরক্কো, সাইপ্রাসসহ কয়েকটি বন্দরে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রিসে বন্দর শ্রমিকদের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের শ্রমিকদেরও যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতালিতে শ্রমিক ইউনিয়ন ইউএসবি সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
যেভাবে শুরু আন্তর্জাতিক এই উদ্যোগ
২০২৫ সালের শুরুর দিকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বন্দর শ্রমিক ইউনিয়নগুলো বেসরকারীকরণের বিরুদ্ধে এবং ফিলিস্তিনে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে সম্মিলিতভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করে।
প্রথম দিকে পাঁচটি দেশের ২০টি বন্দরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী পাঁচটি শ্রমিক ইউনিয়ন এ উদ্যোগে যুক্ত ছিল। পরে এ সংখ্যা বাড়তে থাকে। গ্রিসের এথেন্স, ইতালির জেনোয়া এবং তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ধারাবাহিক বৈঠকের পর গত মে মাসে ইস্তাম্বুল ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। এতে ৩৫টির বেশি বন্দরের শ্রমিক ইউনিয়ন অংশ নেয় এবং ৩০ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কর্মসূচির দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
ঘোষণায় ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধ এবং কিউবা, ভেনেজুয়েলা ও সুদানের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।
ইতালির শ্রমিক ইউনিয়ন ইউএসবির পরিবহন ও বন্দরবিষয়ক জাতীয় সম্পাদক ফ্রান্সেসকো স্তাচ্চিওলি আল জাজিরাকে বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন নিজস্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মসূচি পালন করবে। তবে সবার লক্ষ্য ও সংগ্রামের মূলনীতি একই থাকবে।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ প্রত্যাখ্যান করার অর্থ মানবজাতিকে আরো ভালোভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া।’
অস্ত্র পরিবহনে বাধা সৃষ্টিই মূল লক্ষ্য
আন্তর্জাতিক এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য যুদ্ধের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত বন্দর অবকাঠামোয় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা।
অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর গবেষণাকারী প্রচারাভিযানভিত্তিক সংগঠন ‘নো হারবার ফর জেনোসাইড’ (এনএইচজি) জানিয়েছে, ইসরাইলের বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের জন্য তৈরি যন্ত্রাংশ পরিবহনের ৩১৫টি চালান তারা শনাক্ত করেছে। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব চালান ২৯টি দেশের ৫৬টি বাণিজ্যিক বন্দরের মধ্য দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, ৩০ অক্টোবরের ধর্মঘটে এই ৫৬টি বন্দরই অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে অন্তত এক দিনের জন্য হলেও আন্তর্জাতিক অস্ত্র সরবরাহ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ঘটতে পারে।
এনএইচজির এক মুখপাত্রের দাবি, ধর্মঘটের দিনে ২০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য বন্দরে আটকে থাকতে পারে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯৫ শতাংশ সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। এ ক্ষেত্রে ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইতালির জেনোয়া, লিভোর্নো ও জিওইয়া তাউরো, ফ্রান্সের মার্সেই, গ্রিসের পিরায়েউস এবং মরক্কোর ট্যানজিয়ার বন্দরের সঙ্গে ইসরাইলে অস্ত্র পরিবহনের যোগসূত্র থাকার তথ্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে এনএইচজি।
সংগঠনটির দাবি, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ধর্মঘটে অংশ নেওয়া বন্দরগুলো ওই সাগরের মোট কনটেইনার পরিবহনের ৬৩ শতাংশ পরিচালনা করে। দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে গ্রিসের পিরায়েউস পর্যন্ত অংশগ্রহণকারী বন্দরগুলোর আওতায় রয়েছে মোট কনটেইনার কার্যক্রমের ৭৪ শতাংশ। আর বিশ্বজুড়ে ধর্মঘটে অংশ নেওয়া বন্দরগুলো সামগ্রিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ১৩ দশমিক ৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত।
শ্রমিকদের হাতেই সরবরাহব্যবস্থা বন্ধের ক্ষমতা
গ্রিসের এথেন্সে পিরায়েউস বন্দরের শ্রমিক ইউনিয়ন এনইডিইপের নেতা মার্কোস বেকরিস বলেন, অস্ত্র গন্তব্যে পৌঁছাতে পরিবহন, অবকাঠামো ও শ্রমিকদের প্রয়োজন হয়। আর এই জায়গাতেই শ্রমিকদের শক্তি নিহিত।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরাইলগামী ২১ টন গোলাবারুদবাহী একটি কনটেইনার জাহাজে ওঠানো বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় তিনি বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন।
বেকরিস বলেন, ‘আমরা সেই শ্রমিকদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই, যারা অন্য মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অস্ত্র বোঝাই করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। প্রতিদিন আমাদের হাত তেল ও ঘামে মাখা থাকে। আমরা চাই না সেই হাত অন্য মানুষের রক্তে রঞ্জিত হোক।’
ইতালির সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী লিন্ডা মাগিওরে জানিয়েছেন, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইতালির গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো দিয়ে ইসরাইলে অস্ত্র পরিবহনের বেশ কিছু ঘটনার তথ্য তিনি পেয়েছেন।
তার মতে, ইউরোপে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন সহজ করার একটি বিধিমালা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি কার্যকর হলে আরো কম নজরদারিতে অস্ত্র পরিবহনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বন্দর অবরোধ ও শ্রমিকদের কর্মবিরতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদী পদক্ষেপ।
ফিলিস্তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সমর্থন
গাজা থেকে ২০১৫ সালে চলে যাওয়া এবং বর্তমানে জার্মানির হামবুর্গে বসবাসরত বন্দর শ্রমিক মোহাম্মদ আল-আত্তারও এই আন্তর্জাতিক ধর্মঘটকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরাই শক্তি। মাত্র দুই দিন কাজ বন্ধ রাখতে পারলে হাজারো মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।’
তবে গাজা ইস্যুতে জার্মানির শ্রমিক ইউনিয়ন ভার্ডির নীরবতার সমালোচনা করেছেন তিনি। তার অভিযোগ, ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি নিয়ে ইউনিয়নটির অবস্থান হতাশাজনক।
ফিলিস্তিনের শ্রমিক আন্দোলনও এই ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। পাশাপাশি বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা (বিডিএস) আন্দোলন জোরদার করে ইসরাইলের দখলদারত্ব, বর্ণবৈষম্য এবং ফিলিস্তিনে সহিংসতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয়, কর্পোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সূত্র: আল জাজিরা
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


