উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রেষ্ঠত্ব ও মার্কিন নিরাপত্তার মিথ ভাঙছে

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রেষ্ঠত্ব ও মার্কিন নিরাপত্তার মিথ ভাঙছে
উপসাগর জুড়ে ইরানি হামলার মধ্যে (২০২৬ সালের ১৬ই মার্চ) দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে লাগা আগুন থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। ছবি: এএফপি

দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চল বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) ভুক্ত দেশগুলো নিজেদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও সুরক্ষিত বলেই দেখে এসেছে। এই ধারণার পেছনে ছিল শক্তিশালী অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং সবচেয়ে বড় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি। কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও সেনা উপস্থিতি বহু বছর ধরে এমন এক বিশ্বাস তৈরি করেছিল যে, পশ্চিমা জোট তাদের নিরাপত্তার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা।

কিন্তু সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত সেই দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তাদের কৌশলগত জোট থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের ঝুঁকি, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং প্রতিশোধমূলক হামলার সরাসরি প্রভাব থেকে তারা রক্ষা পাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকদের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারির পর ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অভিযোগ উঠেছে, সম্ভাব্য সংঘাতের আগে উপসাগরীয় মিত্রদের যথেষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। ফলে তারা প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির সুযোগও পায়নি। যুদ্ধ পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পর মার্কিন কূটনৈতিক ও সামরিক কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হলেও উপসাগরীয় দেশগুলোকে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির মধ্যেই থাকতে হয়েছে।

এতে অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মানেই সংকটকালে সমান নিরাপত্তা নয়। বরং এই সম্পর্ক অনেকাংশে কৌশলগত স্বার্থনির্ভর, যেখানে উপসাগরীয় অঞ্চলকে প্রায়ই ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়।

অঞ্চলটির বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারকরা এখন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন বহু বছরের কূটনৈতিক বিনিয়োগ, পশ্চিমা লবিং এবং সফট পাওয়ার প্রচেষ্টা কি সত্যিই উপসাগরীয় সমাজকে নিরাপত্তা দিয়েছে, নাকি কেবল অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পদের উৎস হিসেবেই তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?

সমালোচকদের ভাষ্য, উপসাগরীয় সমাজগুলোকে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে প্রায়ই মানবিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধু তেল, গ্যাস ও কৌশলগত অবস্থানের নিরিখে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে সংকটের সময় এই দেশগুলোর জনগণের নিরাপত্তা ও উদ্বেগ বৈশ্বিক সংহতির কেন্দ্রে জায়গা পায় না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কোথাও কোথাও উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষতিকে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা অঞ্চলটির মানুষের মধ্যে আরও হতাশা বাড়িয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বহির্ভরশীল নিরাপত্তা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হওয়ায় এখন তাদের সামনে বড় প্রশ্ন ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কি পশ্চিমা শক্তির ওপর নির্ভর করে গড়া সম্ভব, নাকি আঞ্চলিক সহযোগিতা, স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা ও নতুন কৌশলগত ভারসাম্যের পথে এগোতে হবে?

অনেকের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য এটি শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক সংকট নয়; বরং নিজেদের অবস্থান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা দর্শন পুনর্বিবেচনার সময়। কারণ বাইরের শক্তির সুরক্ষার যে ধারণা এতদিন অটুট মনে হয়েছিল, তা এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন