দায়মুক্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিতর্ক

গাজা যুদ্ধ বদলে দিয়েছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ

গাজা যুদ্ধ বদলে দিয়েছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ

গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে দেয়নি, বরং বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর নৈতিক অবস্থান নিয়েও গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংঘাত শুরুর তিন বছর পরও এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে। গাজা যুদ্ধের প্রভাব এখন আর কেবল ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত কাঠামো এবং পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকেও প্রভাবিত করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক।

গাজা থেকে আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার

বিজ্ঞাপন

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার মধ্য দিয়ে বর্তমান যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় ইসরাইলের প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরাইল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সেখানে বিপুল প্রাণহানি, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং আবাসিক ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ধ্বংস ঘটে।

গাজার যুদ্ধ ক্রমে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। লেবানন ও সিরিয়ায় সামরিক সংঘর্ষ, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরো জটিল করেছে। ইয়েমেনসহ অন্যান্য অঞ্চলেও সংঘাতের প্রভাব পড়েছে।

এই পরিস্থিতি দেখিয়েছে যে একটি ভূখণ্ডে শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কীভাবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক জোট এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিতে পারে। যুদ্ধের বিস্তার শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক নৌপথ, আঞ্চলিক বিনিয়োগ, শরণার্থী পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও জড়িয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে দ্বৈত নীতির অভিযোগ

আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগে পশ্চিমা দেশগুলোর ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্নটি তোলা হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার ওপর জোর দিয়েছিল। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইউক্রেনের প্রতি রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের পক্ষে এসব নীতি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান ও বেসামরিক মানুষের বিপুল প্রাণহানির ঘটনায় পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষত ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের অব্যাহত সমর্থন আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগকে জোরালো করেছে।

একই ধরনের আন্তর্জাতিক নীতি এক ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং অন্য ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মিত্রের কারণে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নেওয়া পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তবে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান এক নয়। তাদের মধ্যে সামরিক সহায়তা, অস্ত্র রপ্তানি, যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা এবং ইসরাইলের নীতির সমালোচনা নিয়ে পার্থক্য রয়েছে। তাই পুরো পশ্চিমা বিশ্বকে একটি অভিন্ন অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশভিত্তিক নীতি ও সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি সহিংসতা

গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সংঘাতের অবসানের প্রত্যাশা তৈরি করলেও তা স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। ওই দিন গাজায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হন বলে চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী হামাসের সদস্যদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর কথা জানায়; হামাসের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং গাজার পুনর্গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য শুধু গোলাগুলি বন্ধ করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ, জিম্মি ও আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে সমাধান, গাজার পুনর্গঠন এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ। যুদ্ধবিরতি বারবার ভেঙে পড়লে সাধারণ মানুষের জীবন আরো অনিশ্চিত হয়ে ওঠে এবং কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়।

সামরিক প্রযুক্তি ও যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা

গাজা যুদ্ধ আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সামরিক লক্ষ্য শনাক্তকরণ, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং আক্রমণের পরিকল্পনায় স্বয়ংক্রিয় বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। এ ধরনের প্রযুক্তি সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়াতে পারে। কিন্তু লক্ষ্য শনাক্তকরণে ভুল, অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভরতা এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতির দায় নির্ধারণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বেসামরিক মানুষ ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা, আনুপাতিকতার নীতি অনুসরণ করা এবং সম্ভাব্য বেসামরিক ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য। সিদ্ধান্ত গ্রহণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হলেও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব বিলুপ্ত হয় না। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যত বাড়ছে, যুদ্ধের মানবিক ও আইনগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও কি ততটা শক্তিশালী হচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে জনমতের পরিবর্তন

গাজা যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্ম, প্রগতিশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই পরিবর্তন পশ্চিমা সরকারগুলোর পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তাদের সমাজের কিছু অংশের মূল্যবোধের ব্যবধানকে সামনে এনেছে। ফিলিস্তিনিদের মানবিক দুর্দশা, যুদ্ধবিরতির দাবি এবং ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরো তীব্র হয়েছে।

তবে জনমতের পরিবর্তনকে সব জনগোষ্ঠী বা সব রাজনৈতিক দলের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বিভিন্ন জরিপে মতামতের পার্থক্য দেখা যায় এবং সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থানও বদলায়। তা সত্ত্বেও গাজা যুদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায় ফিলিস্তিন প্রশ্নকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কোন পথে?

গাজা যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব হতে পারে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট। আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর হবে কি না, তা শুধু আইন ও চুক্তির অস্তিত্বের ওপর নির্ভর করে না; বরং শক্তিশালী ও দুর্বল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

যদি কোনো রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বা আন্তর্জাতিক মিত্রতার কারণে তার কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে অন্য রাষ্ট্রগুলোও আন্তর্জাতিক নিয়মের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এতে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনকে শুধু গাজা যুদ্ধের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করাও যথাযথ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্থান এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতাও বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। গাজা যুদ্ধ এসব বিদ্যমান টানাপোড়েনকে আরো দৃশ্যমান করেছে।

যুদ্ধের অবসানই বড় পরীক্ষা

গাজা যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও পশ্চিমা নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংঘাতের বিস্তার, বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার অসামঞ্জস্য নিয়ে বিতর্ক বিশ্বরাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে এই পরিবর্তনের চূড়ান্ত পরিণতি এখনো নির্ধারিত নয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসরণ এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য সমাধানের উদ্যোগ ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে।

গাজা যুদ্ধের তিন বছর পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তাই দুটি পরস্পর সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতার বিস্তার থামানো, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও জবাবদিহির প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই দুই ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়া স্থায়ী শান্তি এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন