লুটপাটে মুখ থুবড়ে পড়েছে এসডিএফের কার্যক্রম

লুটপাটে মুখ থুবড়ে পড়েছে এসডিএফের কার্যক্রম

কোটি কোটি টাকা লুটপাটে মুখ থুবড়ে পড়েছে রংপুরের বদরগঞ্জে সামাজিক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের (এসডিএফ) কার্যক্রম। একসময় দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের নারীদের সংগঠিত করে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে উপজেলার ১০ ইউনিয়নের সব সমিতির কার্যক্রম বন্ধ। কোথাও কার্যালয় ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে, কোথাও তালা ভেঙে ঘর ব্যবহার করা হচ্ছে গোখাদ্য, জ্বালানি, ধান-ভুট্টা ও গবাদিপশু রাখার কাজে। অনেক কার্যালয়ের দরজা-জানালা ভাঙা এবং চেয়ার-টেবিলসহ আসবাবপত্রও নেই।

জানা গেছে, ২০১১ সালে বদরগঞ্জ উপজেলার ১০ ইউনিয়নে এসডিএফের কার্যক্রম শুরু হয়। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে জমি কিনে সমিতির কার্যালয় নির্মাণ করা হয়। জমি কেনা ও কার্যালয় নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি সমিতিতে দুস্থ ও অসচ্ছল পরিবারের নারীদের সদস্য করা হয়। তাদের স্বাবলম্বী করে তুলতে ঋণ দেওয়া হতো। সমিতির সভাপতি সদস্যদের কাছ থেকে কিস্তি আদায় করে তা প্রকল্পের নিজস্ব ব্যাংক হিসেবে জমা দিতেন। শুরুতে কার্যক্রম ভালোভাবে চললেও বছর খানেক পর তা ধীরে ধীরে কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে অধিকাংশ সমিতির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে বদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, অনেক সমিতির কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত। কোনো কোনো কার্যালয় ঝোপঝাড়ে ঘেরা। কোথাও আবার তালা ভেঙে স্থানীয় লোকজন ঘর ব্যবহার করছেন। কয়েকটি কার্যালয়ে ধান, ভুট্টা ও জ্বালানি রাখা হয়েছে। কোথাও গরু-ছাগলও রাখা হচ্ছে। অনেক ভবনের দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্রও নেই। সদস‍্যদের জমানো টাকা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ আছে অনেক।

লোহানীপাড়া ইউনিয়নের শিমুলঝুড়ি এসডিএফ গ্রাম সমিতির কাছে জমি বিক্রি করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা মমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, ২০১০ সালে প্রায় ১০ শতাংশ জমি ১০ লাখ টাকায় সমিতির নামে বিক্রি করেন। পরে সেখানে সমিতির পাকা কার্যালয় নির্মাণ করা হয়। সদস্যদের মধ্যে লাখ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হলেও সেই ঋণের বড় অংশ আর আদায় হয়নি বলে তিনি জানান।

স্থানীয় কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, তারা সমিতিতে সঞ্চয়ের টাকা জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাদের অনেকেই সেই টাকা আর ফেরত পাননি।

বদরগঞ্জ উপজেলা শহর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পূর্বে মণ্ডলপাড়া এলাকায় সাহেবগঞ্জ-নাগেরহাট পাকা সড়কের পাশে এসডিএফের একটি টাইলস করা একতলা ভবন রয়েছে। সেখানে একসময় প্রকল্পের অফিসের কার্যক্রম চলত। পরে ভবনটির মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে কর্মকর্তারা চলে যান। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মোশরেফা নামের এক নারী মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়ার চুক্তিতে ভবনটি হাফেজ মাওলানা তুহিন মিয়ার কাছে ভাড়া দেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে সেখানে একটি মহিলা হাফেজিয়া মাদরাসায় কোরআন শিক্ষার কার্যক্রম চলছে।

এ বিষয়ে হাফেজ মাওলানা তুহিন মিয়া বলেন, তিনি যার কাছ থেকে ভবনটি ভাড়া নিয়েছেন, তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। মোশরেফা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এসডিএফের প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ২০১১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল তিন বছর। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের কার্যক্রম ২০১৫ সালের নভেম্বরের দিকে শেষ হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

এসডিএফের রংপুর জেলা ব্যবস্থাপক নাসরুল্লাহ খানের সঙ্গে লোহানীপাড়া, কুতুবপুর, কালুপাড়া, রামনাথপুর, দামোদরপুর, গোপালপুর, গোপিনাথপুর, রাধানগর, বিষনোপুর ও মধুপুর ইউনিয়নের কার্যক্রম এবং প্রকল্পের নথিপত্র সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে তিনি বলেন, বদরগঞ্জ অফিসের প্রধান আলমিনা বেগমের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার কথা। তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তথ্য পাওয়া যাবে।

ব্যবস্থাপকের পরামর্শ অনুযায়ী গত ২২ আগস্ট দুপুরে বদরগঞ্জ অফিসের প্রধান আলমিনা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অফিসে কোনো কাগজপত্র নেই; সব নথি রংপুরের প্রধান কার্যালয়ে রয়েছে।

প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, জমি কেনা, ভবন নির্মাণ এবং ঋণ বিতরণ ও আদায়ের বিষয়ে এসডিএফের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন