হিজাব নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তুরস্ক-আজারবাইজান সম্পর্ক ফাটলের শঙ্কা

হিজাব নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তুরস্ক-আজারবাইজান সম্পর্ক ফাটলের শঙ্কা

আজারবাইজানের স্কুলগুলোতে হিজাব নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ঘিরে তুরস্কের বিরুদ্ধে উত্তেজনা উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে বাকু। দেশটির ক্ষমতাসীন নিউ আজারবাইজান পার্টি (ওয়াইএপি) মঙ্গলবার অভিযোগ করেছে, তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) কয়েকজন নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম এ ইস্যুতে ‘কৃত্রিম উত্তেজনা’ সৃষ্টি করছে। এ নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে দলটি।

বিজ্ঞাপন

আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের নেতৃত্বাধীন দলটি তুরস্কের প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা ওকতাই সারালসহ একেপির কয়েকজন নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব নেতা আজারবাইজানের স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন।

সোমবার সারাল বলেন, হিজাব পরার কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা গ্রহণযোগ্য নয়। এ নীতি থেকে সরে আসতে আজারবাইজান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সম্প্রতি আজারবাইজানের বিভিন্ন স্কুলের বাইরে হিজাব নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের কান্না ও বিক্ষোভের ভিডিও তুরস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরই বিষয়টি নিয়ে আঙ্কারার ওপর আজারবাইজানের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার চাপ বাড়ে।

বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ

আজারবাইজানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য নতুন পোশাকবিধি কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য ২১ সেপ্টেম্বর এবং শিক্ষকদের জন্য ৬ অক্টোবর নতুন বিধিমালা গৃহীত হয়। হিজাব নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে সোমবার অন্তত ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আজারবাইজানের কর্তৃপক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই দিন দেশটিতে ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়া হয় বলেও খবর পাওয়া গেছে। এতে এক্স, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটে।

তুরস্কের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের জবাবে আজারবাইজানের ক্ষমতাসীন দলের কঠোর বিবৃতির পরও আঙ্কারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজারবাইজানবিরোধী মন্তব্যকে সরকার-সমর্থিত প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখেছিল বাকু।

ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও সমালোচনা

হিজাব বিতর্কের পাশাপাশি ইসরাইলের সঙ্গে আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও তুরস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একাংশের সমালোচনা বাড়ছে। গত মাসে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় জাতিসংঘের অধিবেশনকক্ষ ত্যাগ না করায় আজারবাইজানের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে নিউ আজারবাইজান পার্টি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে বাকু। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে দলটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, ফিলিস্তিনকে আর্থিক ও মানবিক সহায়তা দিয়েছে আজারবাইজান। দেশটিতে ফিলিস্তিনের দূতাবাসের কার্যক্রমও আজারবাইজান সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হয়। এ ছাড়া পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে বারবার অবস্থান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আলিয়েভ।

‘কোনো দেশ অন্য মুসলিম জাতির ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না’

হিজাব নিষেধাজ্ঞার সমালোচনার জবাবে ক্ষমতাসীন দলটি বলেছে, ইসলামি বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রেরই অন্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া কিংবা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ানের প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যে দলটি আরো বলেছে, মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার দাবি বাস্তব সহযোগিতা, সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে; আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতার মাধ্যমে নয়।

হিজাব নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে দলটি জানায়, আজারবাইজান সংবিধান অনুযায়ী একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তাদের মতে, ধর্মীয় পোশাকের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা তুর্কি জনগণের ঐক্য কিংবা মুসলিম বিশ্বের সংহতির জন্য সহায়ক নয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের বিষয়কে আজারবাইজানের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের নীতি থেকে বিরত থাকতে একেপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি।

‘এক জাতি, দুই রাষ্ট্র’ নীতি নিয়েও বার্তা

তুরস্ক ও আজারবাইজানের মধ্যে ভাষা, জাতিগত পরিচয় ও সংস্কৃতিগত ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। ২০২০ সালের দ্বিতীয় নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে তুরস্ক আজারবাইজানের অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিল। ওই যুদ্ধে বাকুকে ড্রোন, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের পাশাপাশি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ও বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করেছিল আঙ্কারা।

দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত ‘এক জাতি, দুই রাষ্ট্র’ নীতির কথাও বিবৃতিতে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে নিউ আজারবাইজান পার্টি। প্রয়াত আজারবাইজানি প্রেসিডেন্ট হায়দার আলিয়েভের প্রবর্তিত এ নীতির অর্থ ব্যাখ্যা করে দলটি বলেছে, দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন থাকলেও তারা পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এক জাতি, দুই রাষ্ট্র’ নীতি কোনোভাবেই এক দেশের অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ কিংবা নিজস্ব রাজনৈতিক ও আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার ভিত্তি হতে পারে না। তুরস্কের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য অব্যাহত থাকলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে দলটি।

উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা আঙ্কারার

আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের সমালোচনামূলক বক্তব্যের পর গত সপ্তাহে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিলেন, আজারবাইজানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছা আঙ্কারার নেই। তুরস্ক সরকারের পক্ষ থেকেও এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। ওই কর্মকর্তা বিষয়টিকে ভুল-বোঝাবুঝি হিসেবে উল্লেখ করে জানান, বাকুকে আশ্বস্ত করতে তুরস্কের উচ্চপর্যায় থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে।

তুরস্কের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আজারবাইজানের পরোক্ষ সমালোচনার পাল্টা জবাব না দিয়ে উত্তেজনা কমানোর দিকেই মনোযোগ দেবে আঙ্কারা। দুই দেশের যৌথ জ্বালানি, পরিবহন ও সামরিক বিনিয়োগের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে এক কর্মকর্তা আজারবাইজানকে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তার মতে, দুই দেশের মধ্যে আরো যোগাযোগ ও আলোচনা হলে অতীতের মতো এবারও উত্তেজনা প্রশমিত হতে পারে। তবে হিজাব নিষেধাজ্ঞা ঘিরে সাম্প্রতিক বিরোধ দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রের সম্পর্কে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন