ডাম্পিংয়ে ৩৬ হাজার গাড়ি, বাড়ছে পুলিশের বোঝা

ডাম্পিংয়ে ৩৬ হাজার গাড়ি, বাড়ছে পুলিশের বোঝা
রাজধানীর দারুস সালামে পুলিশের ডাম্পিং করা গাড়ি। ছবি: রফিকুর রহমান রেকু

রাজধানীর বিভিন্ন ডাম্পিং স্টেশন ও থানা চত্বরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৩৬ হাজার যানবাহন। বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা এসব গাড়ির মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে, অনেকগুলো পরিণত হচ্ছে ভাঙ্গারিতে। মামলা ও মালিকানা জটিলতায় আটকে থাকা এসব যানবাহন একদিকে যেমন পুলিশের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে শতকোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। উল্টো এসব গাড়ি ডাম্পিংয়ের জন্য নতুন জায়গা খুঁজতে হচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি)।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো যানবাহন জব্দের পর প্রকৃত মালিকানা প্রমাণে ব্যর্থতা, আইনি জটিলতা, দুর্ঘটনা, ফিটনেস সনদ না থাকা, বিভিন্ন অভিযানে আটক, চুরি বা ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হওয়াসহ নানা কারণে বিপুলসংখ্যক গাড়ি ডাম্পিং করা হয়। মামলা ও মালিকানা প্রমাণের দীর্ঘসূত্রতার কারণে একবার ডাম্পিংয়ে গেলে অনেক গাড়িই আর সহজে সেখান থেকে বের হতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

ডিএমপি সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর কয়েকটি ডাম্পিং স্টেশন ও থানা চত্বরে বর্তমানে প্রায় ৩৬ হাজার গাড়ি পড়ে আছে। অব্যবস্থাপনার কারণে খোলা আকাশের নিচে বছরের পর বছর পড়ে থেকে ধীরে ধীরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এসব যানবাহন। চুরি হয়ে যাচ্ছে গাড়ির মূল্যবান যন্ত্রাংশও।

গত এক মাসেই রাজধানীর ৫০ থানাসহ স্থায়ী ও অস্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনে সাড়ে ১৫ হাজারের বেশি যানবাহন পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ হাজারই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা-ভ্যান। এ ছাড়া ২৬৫টি বাস, ৩০টি ট্রাক, ১৩টি কাভার্ডভ্যান এবং ২৩৪টি মোটরসাইকেল রয়েছে। এসবের বেশিরভাগই উত্তরা দিয়াবাড়ি ডাম্পিং স্টেশনে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, সড়কে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের কারণে প্রতিদিনই কিছু না কিছু যানবাহন ডাম্পিং স্টেশনে পাঠানো হয়। রাজধানীর যেকোনো থানায় গেলে দেখা যায়, থানা ভবনের চারপাশে জরাজীর্ণ ও লক্কর-ঝক্কর গাড়ির স্তূপ। দুর্ঘটনা, মাদকদ্রব্য বহন, চোরাচালানসহ বিভিন্ন মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ নানা ধরনের যানবাহন বছরের পর বছর পড়ে আছে। বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকায় রাজধানীর অনেক থানাই এখন জব্দ হওয়া গাড়ির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

ডিএমপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত ৩০ আগস্ট একদিনেই রাজধানীর ৫০ থানায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ২,১১৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার বিপরীতে ৪৯৯টি গাড়ি ডাম্পিং এবং ২১০টি রেকার করা হয়।

এরপর গত ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ২,৩৭৭টি মামলা করে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। এ সময় ৫৫৭টি গাড়ি ডাম্পিং এবং ২১১টি রেকার করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুরক্ষিত কোনো স্থাপনা না থাকায় খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে জব্দ হওয়া কোটি কোটি টাকার গাড়ি। দিনের পর দিন অযত্ন-অবহেলায় ও মামলা জটিলতায় হাজার হাজার গাড়ি নষ্ট হলেও এসব সম্পদ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ খুবই সীমিত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর ৫০ থানা এলাকায় প্রায় তিন হাজার ডাম্পিং গাড়ি রয়েছে। তবে মিরপুর ট্রাফিক বিভাগের একটি সূত্রের দাবি, শুধু মিরপুর বিভাগেই ৪৭৬টি গাড়ি বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দারুসসালাম ডাম্পিং স্টেশনে ৬৫টি মোটরসাইকেল ঠিকানাবিহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

অবশ্য পুলিশ বলছে, ডাম্পিং স্টেশনে থাকা অধিকাংশ গাড়ির মামলা এখনো চলমান। বিভিন্ন মামলার আলামত হিসেবে এসব গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অব্যবস্থাপনার কারণে কোটি কোটি টাকার গাড়ি নষ্ট হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় মামলা হওয়ার পর সাধারণত যানবাহন আলামত হিসেবে জব্দ করে থানার ডাম্পিং স্টেশনে রাখা হয়। এসব যানবাহনের মধ্যে মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ বড় যানবাহনও রয়েছে। আইনি জটিলতার কারণে বছরের পর বছর পড়ে থাকায় এসব গাড়ির ইঞ্জিন, যন্ত্রাংশসহ মূল্যবান সামগ্রী চুরি হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় গাড়িতে জং ধরছে, নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে প্রকৃত মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর গাড়ি ফেরত পেলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যবহারের উপযোগী থাকে না। ফলে মালিকদের কেউ কেউ গাড়ি নিতে আর আগ্রহ দেখান না। জব্দ করা ভালো অবস্থার কিছু যানবাহন অবশ্য আদালতের নির্দেশনা নিয়ে পুলিশ ব্যবহার করছে। তবে এর সংখ্যা খুবই সীমিত।

পড়ে থাকা গাড়িগুলোর ইঞ্জিন শুধু নষ্টই হচ্ছে না, অনেক গাড়ি ক্রমেই মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতায় এক সময় জব্দ গাড়ি ফেরত পেলেও অনেক মালিকের কাছে সেটি ভাঙ্গারি হিসেবে বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না বলে জানিয়েছেন ডাম্পিংয়ের সুপারভাইজার নান্নু মিয়া।

তিনি বলেন, অনেক গাড়িতে নম্বর প্লেট থাকলেও ক্রস চেক করতে গেলে ওই নম্বরের কোনো হদিস পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকরাও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করতে পারেন না, তাই গাড়িও নিতে আসেন না। আবার যেসব গাড়ি বছরের পর বছর পড়ে থাকে এবং বারবার নোটিস দেওয়ার পরও মালিকরা কোনো খোঁজ নেন না বা জবাব দেন না, তদন্ত শেষে সেসব গাড়ি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে নিলামে তোলা হয়।

ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মামলায় জব্দ গাড়ির বিষয়ে আদালতের নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সে নির্দেশনা অনুযায়ী আদালতের অনুমতি নিয়ে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, লাইসেন্সবিহীন, চোরাই, দুর্ঘটনাকবলিত, মাদক বহনকারী, অবৈধ পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃতসহ বিভিন্ন কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী যেসব যানবাহন জব্দ করে, সেগুলো আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশনে রাখা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক উত্তর) শামসুর রহমান ভূঞা বলেন, গাড়ির নিরাপদ ডাম্পিংয়ের জন্য আমরা একটি জায়গা খুঁজছি। উত্তরায় পুলিশ লাইনসের পাশে একটি জায়গা দেখা হয়েছে। আশা করছি সেখানে ডাম্পিং করা যাবে। পুলিশ কখনই গাড়ি ডাম্পিংয়ে বেশিদিন আটকে রাখতে চায় না। নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গাড়ি নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যাদের গাড়ি, তারা মালিকানা প্রমাণে ব্যর্থ হলে সেই গাড়ি থেকে যায়।

মামলার আলামত হিসেবে জব্দ গাড়ির বিষয়ে তিনি বলেন, আলামত হিসেবে আমরা গাড়ি জব্দ করি। কিন্তু স্থায়ীভাবে রেখে দিই না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন