জনপ্রশাসন ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে জোর বিতর্ক চলছে। এসব দলীয় নিয়োগের জেরে বাংলাদেশে মার্কিন পদ্ধতির প্রশাসন নিয়ে ব্যাপক আলোচনাও চলছে। কেউ কেউ বলছেন, দলীয় লোকদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের মডেল অনুসরণ করাই শ্রেয়।
সরকারের ১২টি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে সম্প্রতি বিএনপি নেতাদের নিয়োগের পর এ আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পাশাপাশি বিদ্যমান প্রশাসনে জেঁকে বসা ঘুস-দুর্নীতি, অনিয়ম, চাকরি শেষে কর্মকর্তাদের উন্নত রাষ্ট্রে থিতু হওয়ার মানসিকতা এবং সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরে তৈরি হওয়া অলিগার্ক শ্রেণি ও আওয়ামী প্রশাসনে নাকাল ছিল অন্তর্বর্তী সরকারও। সেই সরকারের উপদেষ্টারা চোরতান্ত্রিক প্রশাসনের বিদ্যমান কাঠামো ভাঙতে না পারার ব্যর্থতা স্বীকার করে বক্তব্যও দিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল সোসাইটির সদস্য, শিক্ষাবিদ ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রশাসনে রাজনৈতিক নেতাদের পুনর্বাসন ও বিভিন্ন স্তরে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের বিষয়ে পরিসংখ্যান তুলে ধরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানান, দেশে মার্কিন পদ্ধতির সরকারের প্রসঙ্গটি বর্তমান সরকারের সময়ে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের মাধ্যমে। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয় দলীয় অনুগতদের।
এছাড়াও দলীয় বিবেচনায় বর্তমান প্রশাসনের মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার সংখ্যা ২২ জন। এর বাইরে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পদমর্যাদার আরো ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদেও এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরিধি উল্লেখযোগ্য বেড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে ‘মার্কিন পদ্ধতি’ প্রয়োগের প্রাসঙ্গিকতা এসেছে বলেও জানান বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে আধুনিক জনবান্ধব প্রশাসন গঠনের বিষয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার সংক্রান্ত মুয়ীদ কমিশনের প্রতিবেদনেও সুপারিশ করা হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসও জনপ্রশাসনকে জনবান্ধব করতে কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলেছেন।
জনপ্রশাসনে মার্কিন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে মার্কিন পদ্ধতি প্রাসঙ্গিক কি নাÑ এমন প্রশ্ন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাভানা স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক ড. সিরাজুল আই ভূইয়া এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ খানের কাছে।
এ বিষয়ে ড. সিরাজুল ভূঁইয়া আমার দেশকে বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও রাজনৈতিক নিয়োগ হচ্ছে। তবে পার্থক্য হলো এখানে (যুক্তরাষ্ট্র) উপযুক্ত লোককে উপযুক্ত জায়গায় সরকারের নীতি, কর্মসূচি ও নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। মেধা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রাধান্য পায় নিয়োগের ক্ষেত্রে।
তিনি বলেন, নতুন প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিসভার বাইরেও রাষ্ট্রের প্রায় চার হাজার পদে রাজনৈতিক নিয়োগ দেন। এর মধ্যে ১২০০ পদে সিনেটের অনুমোদন নিতে হয় তাকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রকৃত শক্তিই রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া এসব ব্যক্তি। তারা ব্যক্তিগত জীবনে সৎ, যোগ্য, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কি নাÑ এটি যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। তারা সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করে থাকেন। এছাড়াও শতাধিক সিনিয়র এক্সিকিউটিভ পদে নিয়োগ দিয়ে থাকেন প্রেসিডেন্ট। তবে এসব নিয়োগ রাজনৈতিকভাবে হলেও তা শুধুই দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নয় বরং নিজ নিজ যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের ওইসব পদের উপযুক্ত মনে করে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে নিয়োগ দেওয়া হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ড. সিরাজুল আরো বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিয়োগ করা বিচারকরা তার বহু গুরুত্বপূর্ণ ডিক্রি ও প্রশাসনিক আদেশের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ হলেও তারা প্রেসিডেন্টের একক স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেন।
ডা. ওয়াজেদ খান বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রশাসনে নীতিনির্ধারণী পদে নতুন করে চার হাজারের বেশি কর্মকর্তা নিয়োগ হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও বিভিন্ন দপ্তরপ্রধানদের নিয়োগ হয় সিনেটের অনুমোদনে। তবে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাসহ জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারক ও উপদেষ্টাসহ এ ধরনের সাড়ে চারশ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনুমোদন নিতে হয় না।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সবাই দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করেন। তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে হয়রানি কিংবা ফাইল আটকে ঘুস নেওয়ার একটি অভিযোগও পাওয়া যায় না। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়মের অভিযোগও উল্লেখ করার মতো নয়। অথচ আমাদের দেশে ঘুস ছাড়া কেউ দায়িত্ব পালন করলে সেটা গণমাধ্যমে সংবাদ হয়।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসসহ বিভিন্ন পদে চাকরি করেছেন এমন হাজার হাজার কর্মকর্তা এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। যেসব কর্মকর্তার লক্ষ্যই থাকে অবসর গ্রহণের পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উন্নত দেশে বসবাস করবেন, তাদের কাছ থেকে দেশ ও সেই দেশের জনগণ কোনো সেবা পাবে না এবং পাওয়ার কথাও নয়। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রেরও একই অবস্থা। তারা কেউ দেশের জন্য নয়, বরং তার পরিবারের জন্য কাজ করে থাকেন।
ডা. ওয়াজেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ফাইল আটকে ঘুস খান না। কারণ তাকেও কোথাও কাউকে ঘুস দিতে হয় না। বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তারা ঘুস খান আবার তাকে নিজের কাজের জন্য ঘুস দিতেও হয়। এমনও নজির রয়েছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে তারই ছাত্রকে ঘুস দিতে হচ্ছে। কাজেই, বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোতে জনসেবা কোনোভাবেই নিশ্চিত হবে না।
সরকার মার্কিন পদ্ধতির প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে যাচ্ছে কি নাÑ এমন প্রশ্ন ছিল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারির কাছে। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই ফ্যাসিবাদমুক্ত দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন। ইতোমধ্যেই আপনারা সরকারের পদক্ষেপ দেখতে পেয়েছেন। হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক সাড়ে ১৫ বছরের সময়ে প্রশাসনকে দলীয়ভাবে ব্যবহারের খারাপ নজির স্থাপন করেছিল। আমরা প্রশাসনকে সেখান থেকে বের করে শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে চাই। চুক্তিভিত্তিক যারাই বিভিন্ন সংস্থা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়েছেন, তারা সবাই ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও দক্ষ।’ তাদের অভিজ্ঞতা ও যোগ্য নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানগুলোতে গতিশীলতা আসবে বলেও মনে করেন তিনি।
রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পদে দলীয় নেতাদের নিয়োগের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে। তাদের দাবি, রীতি অনুযায়ী এসব পদগুলোতে সাধারণত অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়। তবে আগেও বিভিন্ন সময়ে এসব পদের কোনো কোনোটিতে রাজনৈতিক নিয়োগ হয়েছে। এবারই ঢালাওভাবে একযোগে ১২টি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় নিয়োগ হয়েছে। এর আগে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে সরকারদলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের নিয়েও বিরূপ মন্তব্য করেছেন বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। দলের প্রতি তাদের কারো কারো কমিটমেন্ট নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা।
আলী ইমাম মজুমদার ও ড. ইফতেখারুজ্জামানের মত
যার কাজ তাকে দিয়েই করানো উচিত বলে মনে করেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। আমার দেশকে তিনি বলেন, জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেমন রাজনীতিতে জড়ানো উচিত নয়, তেমনি প্রশাসনের পদগুলোতেও ঢালাওভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া ঠিক নয়। এটি প্রশাসনকে আরো বেশি করে বিতর্কিত করে তুলবে। কারণ এমনিতেই আমাদের জনপ্রশাসন রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যে দল ক্ষমতায় আসে, প্রশাসনের তার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবল আশঙ্কা কাজ করে। এমন অবস্থায় প্রশাসনকে রাজনীতির বাইরে রেখে সত্যিকারের জনবান্ধব করে গড়ে তোলা আবশ্যক।
ঢালাওভাবে সরকারি সংস্থার শীর্ষপদে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ উদ্বেগজনক, তবে মোটেও অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়, বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয়ও নয় বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। আমার দেশকে তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতো নজরদারি সংস্থার শীর্ষপদ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছে বা অপসারণ করেছে। সব ক্ষেত্রেই সরকার কর্তৃত্বপরায়ণ আমলের মতো রাষ্ট্র কাঠামোতে দলীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্যের সংস্কৃতি অনুসরণ করছে।
আওয়ামী সরকারের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, কর্তৃত্বপরায়ণ চোরচক্রের আমলে সব পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত দলীয়করণের ফলে দেশবাসীর মতো ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভুক্তভোগী হয়ে কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে। মূলত সে কারণেই ক্ষমতাসীন দলের (বিএনপি) ৩১-দফা, নির্বাচনি ইশতেহারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা ছিল। অথচ বাস্তবে তার প্রয়োগে বড় ধরনের সদিচ্ছার ঘাটতি ও বিপরীতমুখী চর্চা দেখা যাচ্ছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ব্যতিক্রমী কিছু অভূতপূর্ব ব্যক্তিগত প্রয়াস ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সরকার পরিচালন প্রক্রিয়ায় একচ্ছত্র দলীয়করণভিত্তিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখার সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদের পতন হয়েছে, কর্তৃত্ববাদী দলীয়করণের পরিবর্তন হয়নি, হয়েছে শুধু ‘উইনার টেকস অল’ চর্চার পালাবদল।
হাসিনার প্রশাসনে কাবু সরকার
জনপ্রশাসন নিয়ে কাজ করেন এমন শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, আমলাতন্ত্র সেই আগের ধাঁচেই রয়ে গেছে। রেজিম পাল্টালেও চরিত্র বদলায়নি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। ফাইল আটকে ঘুস আদায়, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, দুর্নীতি ও অনিয়ম কোনো অংশেই কমেনি। ক্ষেত্রবিশেষ বেড়েছে বলেও মনে করেন তারা।
‘আওয়ামী প্রশাসন’ হিসেবে পরিচিত হাসিনা সরকারের লুটপাটের সঙ্গী প্রশাসনের বড় অংশটি বর্তমান বিএনপি সরকারের কাঁধে ভর করে আছে বলেও অভিযোগ ওই সময় বঞ্চিত হয়ে অবসরে যাওয়া কয়েকজন চৌকস কর্মকর্তার। তাদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারও আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া কর্মকর্তাদের স্বপদে বহাল রেখে দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়ে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতার দায় এখন নতুন সরকারের কাঁধেও পড়েছে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবাদ সম্মেলনে জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার (২৮ লাখ কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। এর মধ্যে বড় অংশ পাচারের পেছনে দেশের আমলাতন্ত্রের হাত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে তারা সরাসরি জড়িতও ছিল বলে শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেবাগ্রহীতাদের মতে, রেজিম বদলালেও ঘুস, দুর্নীতি, অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো হেরফের হয়নি। ফাইল আটকে টাকা আদায় সেই আগের মতোই রয়েছে। ঘুস ছাড়া কোনো ফাইল নড়াচড়া তো দূরের কথা, কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে কথা বলাও মুশকিল। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশন কার্যালয়, ভূমি অফিস, বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিসগুলোসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারি দপ্তরগুলোতে ঘুসের পরিমাণ আগের চেয়ে বেড়েছে। এমন চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে।
পুলিশ স্টেশন বা থানাসহ সরকারের সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোতে ঘুস আগের চেয়ে বেড়েছে বলেও অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ আট বিভাগীয় শহরের এসব সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
একজন সেবাগ্রহীতা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, ভূমি অফিস থেকে ঘুস ছাড়া কেউ একটি নথি নিষ্পত্তি করতে পেরেছেন এমন নজির নেই। রিয়েল স্টেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ। ঘুস ছাড়া রাজউক থেকে রিহ্যাবের (রিয়েল স্টেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন) কোনো সদস্য একটি নকশা অনুমোদন করতে পেরেছেন, এমন নজির একটিও নেই বলে জানান তারা। ঘুস লেনদেনের এমন চিত্র সারা দেশেরই বলে জানায় টিআইবিসহ বিভিন্ন সংস্থা।
দেশের আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও প্রকাশ্যে মুখ খুলেছিলেন। ওই সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সফলভাবে সামলান সাবেক আমলা ফাওজুল কবির খান। বিদায় নেওয়ার আগে তিনিও আমলাতন্ত্র নিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমলাতন্ত্র একটি জগদ্দল পাথরের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা জনগণের বুকে চেপে বসে আছে। কিছুই করা যায় না এখানে। কোনোরকম মানবিক দায়িত্ববোধই আমাদের এই আমলাতন্ত্রের মধ্যে নেই।’
আমলাতন্ত্রের কাজের ধরনের সমালোচনা করে সাবেক এই সচিব বলেন, ‘সবাই অফিসে আসেন-যান, গাড়িতে চড়েন। কিন্তু মানুষের জীবনের যে দৈনন্দিন সমস্যা, সে বিষয়ে তাদের কোনো সদিচ্ছা নেই। তারা শুধু চিঠি চালাচালি করেন। এই রুম থেকে ওই রুমে চিঠি যায়। সভা হয়, সমিতি হয়, লাঞ্চ হয়, স্ন্যাকস খাওয়া হয়; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। যত কিছুই করার চেষ্টা করেছি, সবকিছুই আটকে আছে।’
প্রশাসন নিয়ে আক্ষেপ মন্ত্রীদেরও
প্রশাসন নিয়ে ক্ষোভ ও আক্ষেপ দুটিই রয়েছে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। প্রভাবশালী এক মন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রশাসন প্রধানমন্ত্রীর কর্মতৎপরতার সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টার আগেই দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেন। অথচ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে কর্মকর্তাদের মধ্যে এর কোনো প্রভাব নেই। ঢিলেঢালাভাবেই চলছে প্রশাসন।
প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণ উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এক উপদেষ্টা আমার দেশকে বলেন, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সাড়ে ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব চেয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে যেসব কর্মকর্তার দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে বা বিদেশে পরিবারের সদস্য রয়েছে তাদের তথ্য চায়। পাশাপাশি পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে তাদের বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের এমন নির্দেশনার বিরুদ্ধে অঘোষিতভাবে বিদ্রোহ করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে সচিবালয় ও এর আশপাশে কমপক্ষে ১৬০০ আন্দোলন হয়। এসব আন্দোলনের অধিকাংশের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন বলেও বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমলাতন্ত্র নিয়ে আক্ষেপ করে বলেছেন, আমার পাঁচ মাসের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতায় দেখছি, দেশে কিছুই বদলায়নি। একইভাবে যারা ঘুস খেত, তারা এখনো ঘুস খায়। তাই জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে রাষ্ট্র ও সমাজে পরিবর্তন আনতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




