মাদকে নীল হচ্ছে ঢাকাসহ সারা দেশ। এমনকি নিভৃত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থী ও তরুণরা আসক্ত হয়ে পড়ছে সর্বগ্রাসী এ নেশায় । এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাচ্ছে। এ মরণ নেশা রুখতে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা নানা উদ্যোগ নিলেও মাদকের সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে না, বরং দিনদিন বাড়ছে। অনেক স্থানে প্রশাসনের নাকের ডগায় বিক্রি হচ্ছে মাদক।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে মাদক কারবারে জড়িত ২৩ হাজার ১৪৬ জন। শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ কারবারিরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে মাদকসামগ্রী। মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮৫ লাখ। যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৫.৮৯ ভাগ। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশের ১৭টি জেলার ১০৫টি পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ, ইয়াবা, ব্লু আইসসহ ২৪ ধরনের মাদক। মাদকের বড় চালান যাচ্ছে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে। ঢাকার ৩০০ স্পটে মাদক দেদার বিক্রি হচ্ছে।
দেশে ইয়াবার প্রধান রুট কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকা। এর পাশাপাশি ব্লু আইসের চাহিদাও বেড়েছে। মাদক কেনার টাকা না দিলে মাদকসেবীরা নিজের পরিবারের সদস্যদের হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। এমনকি নিজের ঘরে আগুনও লাগিয়ে দিচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিএনসি সারা দেশে ৮২ হাজার ৬২৫টি অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানের পর মামলা হয়েছে ২৫ হাজার ২১টি, আসামি ২৬ হাজার ২৭০ জন।
অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাময়িক নয়, সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মাদক সরবরাহের চেইনের লাগাম টানতে হবে। তাহলেই মাদকের বিস্তার বন্ধ হবে। আর পুলিশ বলছে, মাদকের ব্যাপারে তারা কোনো ছাড় দিচ্ছেন না।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি (জনসংযোগ ও মালটিমিডিয়া) কামারুম মুনিরা আমার দেশকে বলেন, ‘মাদকের ব্যাপারে পুলিশের জিরো টলারেন্স রয়েছে।’ ডিএনসির উপপরিচালক (অপারেশনস) মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, ‘সারা দেশে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
অপরাধ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সচেতনতামূলক র্যালি বা খণ্ডকালীন অভিযান দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাদক প্রবেশ ও বিস্তারের মূল উৎস এবং সরবরাহ আগে বন্ধ করতে হবে। সামগ্রিক ও স্থায়ী পরিকল্পনা করে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে।’
গত ২০ অক্টোবর পাবনার ফরিদপুরে নেশার টাকা না পেয়ে নিজের মাকেই কুপিয়ে হত্যা করেছে ছেলে। বিএলবাড়ি ইউনিয়নের লক্ষীকোল জোলাপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ছেলে উদ্দিন সরদারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই দিন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে নেশার টাকা না পেয়ে নিজের বাড়িতেই আগুন দিয়েছে আইয়ুব নামে এক যুবক। ফতেপুর ইউনিয়নের নৈকাহন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে আইয়ুবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এছাড়াও রাজধানীর খিলক্ষেতের পুলিশ হাউজিং-১ এলাকার একটি তিনতলা ভাড়া বাড়ি থেকে মাদক সেবনের অভিযোগে নারীসহ ৮৪ জনকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বাড়িটি পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের।
ডিএনসির হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে মাদক কারবারি রয়েছে ২৩ হাজার ১৪৬ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪,৮৪৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪,৭৭৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ৪,২৬৫ জন, খুলনায় ৩,২০৬ জন, রংপুরে ২,০০১ জন, ময়মনসিংহে ১,৬০৯ জন, সিলেটে ১,১৯৭ জন এবং বরিশালে ১,২৩৭ জন।
রাজধানীতে ৩০০ স্পট
রাজধানী ঢাকা মাদকের বড় বাজার হিসেবে চিহ্নিত। প্রায় ৩০০ স্পটে মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, মিরপুরের বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প, কারওয়ান বাজার রেললাইন, খিলগাঁও, সবুজবাগ, হাজারীবাগ, মহাখালী, তেজগাঁও, তুরাগ, শনির আখড়া, ডেমরা, মুগদা, রায়েরবাজার, গাবতলী, ফকিরাপুল কালভার্ট বস্তি, গোলাপবাগ, সিটি কলোনি, আগারগাঁও বস্তি, গোপীবাগ মেথরপট্টি রেললাইন, সায়েদাবাদ জনপদের মোড়, ভাটারা বালুর মাঠ, কারওয়ান বাজার থেকে নাখালপাড়া রেললাইন, হাজারীবাগের গণকটুলি সিটি কলোনি, উত্তরা রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশ এলাকা, কোতোয়ালি সুইপার কলোনি, স্বামীবাগ রেললাইন, লালবাগের শহীদনগরের ৪ ও ৫ নম্বর গলি, ডেমরা সারুলিয়া নদীরপাড়, শ্যামপুর আইজি গেট বস্তি, কদমতলীর ওয়াসা রেলগেট, শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি ও কাফরুল কাঁঠাল মাঠ এলাকাসহ প্রায় ৩০০ স্পটে বিক্রি হচ্ছে মাদক।
ডেটাবেজের আওতায় আসছে
মাদকাসক্তদের চিকিৎসার পর সহজেই ট্র্যাকিং করা এবং কেস হিস্ট্রি বিশ্লেষণ করে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য ডেটাবেজের উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসি। ডেটাবেজে একজন মাদকাসক্ত কী ধরনের মাদক সেবন করে মাদকাসক্ত হয়েছে, কখন থেকে মাদক সেবন শুরু করেছিল, কতটুকু সেবন করত, মাদক সেবনের দায়ে কারাগারে গিয়েছিল কি না, কারো প্ররোচনায় নাকি নিজের আগ্রহে মাদকাসক্ত হয়েছে, পরিবার নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত না বিত্তশালী এবং বর্তমানে তার শারীরিক-মানসিক অবস্থা কেমন তা অন্তর্ভুক্ত হবে।
যারা সরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্র এবং সরকার অনুমোদিত বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেবেন তারা এ ডেটাবেজের আওতায় আসবে। এতে একজন মাদকাসক্ত পুনরায় মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এলে সহজেই তাকে কর্তৃপক্ষ ডেটাবেজ থেকে দ্রুত চিহ্নিত করে তার বিষয়ে পরবর্তী কী পদক্ষেপ নিলে তিনি মাদক থেকে দূরে থাকবেন তার জন্য কর্তৃপক্ষ সে ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন।
দেশে আসছে নীল কোকেন
ডিএনসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে ফের আসছে আফ্রিকার নীল কোকেন। এর নেশায় বুঁদ হচ্ছেন অভিজাত পরিবারের সন্তানরা। এ মাদকের প্রধান ট্রানজিট থাইল্যান্ড। আফ্রিকার চোরাকারবারিরা থাইল্যান্ডে তাদের চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাচার করছে। এছাড়াও মিয়ানমারের সীমান্ত দিয়েও আসছে নীল কোকেন। এ চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে শাহজালাল বিমানবন্দরে মালাউর নাগরিক নোমথেনডাজো তাওয়েরা সোকোকে গ্রেপ্তার করেছিলেন ডিএনসির কর্মকর্তারা।
গত ৯ মাসে ডিএমপিতে মামলা ও গ্রেপ্তার
গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ডিএমপির ৫০ থানায় ৪,৪৯৮টি মাদকসংক্রান্ত মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬,৪৬৮ জন। ভাটারার মাদক কারবারি রাজু আহমেদের বিরুদ্ধে ৪৭টি, ভাসানটেকের রূপচান আলীর বিরুদ্ধে ৪৩, শাহজাহানপুরের সোহেলের বিরুদ্ধে ২৭ এবং খিলগাঁওয়ের পূর্ব গোড়ানের খালেদ মিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে ২১টি মামলা। তারা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে।
ব্লু-আইশের চাহিদা বাড়ছে
ইয়াবা ছাড়াও ব্লু-আইশের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। রাজধানীতে এটি এখন ইয়াবা ট্যাবলেটের মতোই প্রতিনিয়ত ঢুকছে। দেখতে প্রায় ইয়াবা ট্যাবলেটের মতো, তবে রঙ ভিন্ন। এটি নীল ও সবুজ রঙের হয়ে থাকে। ইয়াবা ট্যাবলেটের চেয়ে বেশি নেশা ও যৌন উত্তেজনা তৈরি করে। ঢাকার অভিজাত পরিবারের সন্তান এবং প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা এ ট্যাবলেট সেবন করে থাকে। উত্তরার কিছু অভিজাত ক্লাবে এ ট্যাবলেট পাওয়া যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


