বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পে যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মান।
কিন্তু ভিন্ন রাজনৈতিক (বিএনপিপন্থি) সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের মৌখিক নির্দেশে মাত্র একদিনের মাথায় ওই নিয়োগ বাতিল করা হয়। পরে চুয়েটের ‘আওয়ামীপন্থি’ অধ্যাপক আসাদুজ্জামানকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিয়োগ ফিরে পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন প্রফেসর হাসনাত। এরই মধ্যে তাকে পুনর্নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছে ইউজিসি। আর পিডি পরিবর্তনে প্রকল্পের অংশীদার বিশ্বব্যাংকের মতামত গ্রহণের কথা বলেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ কমিটি। তবে সে প্রক্রিয়াও বেশ কিছুদিন ধরে ঝুলে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিয়োগপ্রত্যাশী।
সূত্রমতে, ইউজিসি বাস্তবায়নাধীন ‘হিট’ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার অনুদান ও বিশ্বব্যাংক ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে দুই হাজার ৩৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বাংলাদেশ সরকার এবং এক হাজার ৯৮৩ কোটি ১১ লাখ টাকা বিশ্বব্যাংক বহন করবে।
জানা গেছে, হিট প্রকল্পের পিডি নিয়োগ পরীক্ষায় ৩২ প্রার্থীর মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন প্রফেসর হাসনাত। সে অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ তাকে পিডি নিয়োগ দিয়ে আদেশ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু পরের দিন অনিবার্য কারণ দেখিয়ে ওই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে মন্ত্রণালয়। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের মৌখিক নির্দেশেই সেটি বাতিল করা হয় বলে মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা অধ্যাপক আসাদুজ্জামানকে নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। তিনিই পিডি পদে বহাল আছেন।
এদিকে ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে পিডি পদে নিয়োগ ফিরে পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন প্রফেসর হাসনাত। সেখানে তিনি বলেন, শুধুমাত্র আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুসারী না হওয়ায় তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের মৌখিক নির্দেশে সরকারি ছুটির দিনে আমার জিও বাতিল করা হয়।
কিন্তু আইন ও নিয়ম অনুযায়ী আদেশ বাতিল করতে হলে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করতে হয়। সেটির তোয়াক্কা না করে বেআইনিভাবে তড়িঘড়ি করে ওই আদেশ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে বাতিল করা হয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমার একমাত্র অপরাধ ছিল আমার নিয়োগ হয় ২০০৬ সালের ৩০ মে। এ ছাড়া আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরবর্তীতে আবার সভা করে দ্বিতীয় স্থান অধিকারীকে ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুসারী হওয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়।
এদিকে বঞ্চিত প্রার্থী প্রফেসর হাসনাতের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসির মতামত চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী গত বছরের ২৫ নভেম্বর ইউজিসি থেকে মতামত দেওয়া হয় যে, আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মান অন্যায্যতার শিকার হয়েছেন। এ বিষয়ে তার ন্যায্যতা নিশ্চিত করা যেতে পারে। ইউজিসির পরিচালক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান ভূঁইয়া ওই মতামতে স্বাক্ষর করেন।
পরবর্তীতে গত ৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়েরের সভাপতিত্বে হিট প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বেশিরভাগ সদস্য পিডি পরিবর্তন করে প্রফেসর হাসনাতকে নিয়োগের বিষয়ে মত দেন। প্রকল্পটির গতি ধীর বলেও সভায় তুলে ধরা হয়।
ভুক্তভোগী প্রফেসর হাসনাত জানান, ইউজিসির একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিশ্বব্যাংকের দোহাই দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর বর্তমান প্রকল্প পরিচালককে বহাল রাখার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এ কাজে প্রচুর অর্থের আদান-প্রদান করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যা সঠিক তদন্তের দাবি রাখে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ আমার দেশকে জানান, হিট প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসি কোনো দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াই যোগ্য ও মেধাবী হিসেবে প্রার্থী বাছাই করেছিল। প্রথমজনকে নিয়োগের পর বাতিলের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছিল, তা ছিল দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে। এ প্রকল্প নিয়ে যাতে কেউ আঙুল তুলতে না পারে, সেভাবে আমরা কাজ করব। আমরা এটি নিয়ে কোনো ঝুঁকিতে যেতে চাই না। সরকার ও বিশ্বব্যাংক পিডি বদল করতে চাইলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

