বিশেষ ছাড়েও খেলাপি ঋণ ফের ঊর্ধ্বমুখী

রোহান রাজিব

বিশেষ ছাড়েও খেলাপি ঋণ ফের ঊর্ধ্বমুখী

ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে একের পর এক নীতি-সহায়তা, বিশেষ ছাড় ও পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। বরং লাফিয়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ৮৭ হাজার কোটি টাকা কমলেও সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। নতুন করে ঋণখেলাপির বোঝা বাড়ায় দেশের ব্যাংকিং খাত আবারও চাপে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাওয়ায় ঋণ আদায় হচ্ছে না। অন্যদিকে প্রতি প্রান্তিকে সুদ যুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া ডিসেম্বর প্রান্তিকে অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণ কম দেখিয়েছিল; পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল সেগুলো পুনরায় খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করেছে। এসব কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে এক দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট।

তবে বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি আরো বেশি। গত বছরের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল চার লাখ ২০ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, মার্চ শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিল নীতির কারণে ডিসেম্বরের পর মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।

তিনি জানান, বিশেষ নীতির আওতায় মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে অনেক ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এসব ঋণের ওপর ১০ শতাংশের বেশি হারে সুদ আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নীতি-সহায়তা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড থাকায় এ সময়ে মূল অর্থ আদায়ের সুযোগও ছিল না। ফলে সুদ সংযোজনের কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন বলেন, সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা, প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব ঋণ পরিস্থিতির ওপর পড়েছে।

তিনি বলেন, নীতি-সহায়তার সুযোগ থাকলেও সব গ্রাহক তা নিতে পারেননি। কারণ, নীতি-সহায়তা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট অনেক ঋণগ্রহীতার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। ফলে সহায়তার আওতায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল—এমন একটি বড় অংশের গ্রাহক শেষ পর্যন্ত এ সুবিধা নিতে পারেননি।

তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন ব্যাংকের বহিঃনিরীক্ষা (এক্সটার্নাল অডিট) সম্পন্ন হওয়ার পর নিরীক্ষকরা সব ক্ষেত্রে ছাড় দিতে রাজি হননি। অনেক ক্ষেত্রে ঋণকে শ্রেণিকরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি-সহায়তার সুবিধা পেলেও অন্য অনেক ঋণকে নিয়ম অনুযায়ী শ্রেণিকরণ করতে হয়েছে। এসব কারণ সম্মিলিতভাবে পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলেছে। তবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অর্থনীতির সামগ্রিক ধীরগতির প্রবৃদ্ধি।

আড়ালে থাকা ঋণের বোঝা

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ব্যাপকহারে। তবে যেভাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল, সেভাবে তা প্রকাশ করা হয়নি। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দলটি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে, ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।

জানা গেছে, সে সরকারের আমলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিল কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এ তালিকায় নাম রয়েছে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা ও বসুন্ধরা গ্রুপসহ ডজনখানেক প্রতিষ্ঠানের। এসব গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিল। তাই তাদের অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ জামানত, প্রকল্প মূল্যায়ন কিংবা নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ ছাড়াই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

গত এক দশকে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের ঋণ সুবিধা পেয়েছে। ঋণ পরিশোধের সময় এলেও তারা তা শোধ করেনি। উল্টো বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে তাদের ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া থেকে রক্ষা করা হয়েছিল। ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র সামনে আসেনি।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের আমলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা শুরু হয়। এর ফলে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে পৌঁছে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে।

এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়। এতে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে আসে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ নেমে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

খেলাপি কমাতে বিশেষ ছাড়

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে অথবা মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে সচল ও চাঙা করতে উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মাত্র দুই শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেয়। এ ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর। ঋণ নিয়মিত হলে প্রথম দুই বছর ঋণ পরিশোধে বিরতি (গ্রেস পিরিয়ড) পাওয়া যায়।

প্রথম দফায় গত বছরের জুন পর্যন্ত যেসব গ্রাহক খেলাপি ছিলেন, তারাই এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। পরে এ সময়সীমা ওই বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত মাসে জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে তা চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।

জানা গেছে, নীতি-সহায়তার আওতায় এক হাজার ৫১৬টি আবেদনের বিপরীতে এক লাখ ৯৬ হাজার ৪৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন আসে। এর মধ্যে ৩০০টি গ্রুপের ৯০০টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো ২৫০টি ঋণ আবেদন বাস্তবায়ন করেছে। এর মাধ্যমে ২৬ হাজার ১১৪ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।

খাতভিত্তিক চিত্র

গত মার্চ শেষে মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল এক লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণস্থিতি তিন লাখ ২৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। তিন মাসে এ খাতের খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক দশমিক ৪১ শতাংশ পয়েন্ট। ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল এক লাখ ৪৬ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।

বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মোট ঋণস্থিতি ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ চার লাখ ১৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণস্থিতি ৬৭ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ তিন হাজার ২৬৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের চার দশমিক ৮২ শতাংশ।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণস্থিতি ৪৭ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন