আগামী শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো নিয়ে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার, দরপত্রে অনিয়ম ও সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রাক্কলিত দর ফাঁস এবং দরপত্রে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ২৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অন্যদিকে মুদ্রণকাজের ধীরগতি, বিদ্যুৎ সংকট ও নিম্নমানের বই বাতিলের ঘটনায় নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত বই পৌঁছানো নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
যদিও বেশ কয়েক মাস ধরে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল এবার ডিসেম্বরেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু বই ছাপার কাজ তেমন একটা অগ্রগতি না হওয়ায় সরকার এখন সে সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটছে। সুর পাল্টিয়ে গত ৩ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হবে। বইয়ের মানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে প্রাক্কলিত দর ফাঁস এবং দরপত্রের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রায় ২৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগে গত ৬ অক্টোবর রাজধানীর মতিঝিলে এনসিটিবির কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুদক। এ সময় প্রাথমিক প্রাক্কলনের কপি, দাপ্তরিক মূল্যতালিকা এবং বোর্ডের ৪২৩তম সভার কার্যবিবরণীসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করে দুদকের এনফোর্সমেন্ট দল। সংগৃহীত নথি যাচাই করে অভিযোগের বিষয়ে কমিশনে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার দরপত্র প্রক্রিয়া চলাকালে প্রাক্কলিত দর ফাঁস হয়। পরে মুদ্রণশিল্পের ৭৫ জন মালিক দর বাড়ানোর আবেদন করেন এবং সে আবেদনের পর প্রাক্কলিত দর পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এতে সরকারি ব্যয় বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিকের বই ছাপায় ফর্মাপ্রতি গড় কার্যাদেশের দর ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ছিল ২.৩১ টাকা। যা ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে বেড়ে ৩.৩২ টাকা হয়েছে। প্রায় ২৫ লাখ রিম কাগজের হিসাব ধরে অতিরিক্ত ব্যয় ২৫২ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এছাড়া ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতে একক দরপত্র জমা পড়ার তথ্য প্রতিযোগিতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিম্নমানের বই ছাপা নিয়েও বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ বেড়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকার ছয়টি ছাপাখানা পরিদর্শন করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি কাগজ, কালি, ছাপা, কাটিং ও বাঁধাইয়ের মান যাচাই করে নির্ধারিত মান বজায় রাখার নির্দেশ দেন। এর আগে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের অভিযোগে প্রায় তিন লাখ বই ফেরত নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এবার প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি, ইবতেদায়ি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১,৮৯০ কোটি টাকা।
ছাপার অগ্রগতি নিয়েও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ছাপানোর কাজে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ বই ছাপানোর লক্ষ্য থাকলেও বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ঘাটতি ও নিম্নমানের বই বাতিলের কারণে সময়মতো কাজ শেষ করা কঠিন হতে পারে। ছাপাখানার মালিকদের দাবি, অনেক প্রতিষ্ঠানে দিনে ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে শিক্ষামন্ত্রী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মানসম্মত বই প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ছাপাখানার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
দর পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে এনসিটিবির কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন—বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে মুদ্রণশিল্পের মালিকরা দর বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদন নিয়েই দর সমন্বয় করা হয়েছে বলে তাদের দাবি। তবে দরপত্রে অনিয়ম ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
এনসিটিবির সচিব শাহ মুহাম্মাদ ফিরোজ আল ফেরদৌস জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
দরপত্রের অনিয়মের অভিযোগ, দুদকের তদন্ত, নিম্নমানের বই এবং ছাপার ধীরগতি—সবকিছু মিলিয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবার নজর এখন তদন্তের অগ্রগতি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ছাপা ও বিতরণ নিশ্চিত করার ওপর।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

