জুলাই জাদুঘর

ইতিহাসের চত্বরে জনতার ঢল

ইতিহাসের চত্বরে জনতার ঢল
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত সদ্য উন্মুক্ত হওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণ বৃহস্পতিবার ঘুরে দেখেন দর্শনার্থীরা। ছবি: আমার দেশ

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট, ২০২৬), দুপুর ১২টা। সকাল থেকে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টিস্নাত সেই দুপুরের কিছু আগে থেকেই রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের সামনে দেখা গেল প্রচণ্ড ভিড়। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে শত শত দর্শনার্থী সারি বেঁধে সুশৃঙ্খলভাবে প্রবেশ করছিলেন ভেতরে। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ। সব বয়সের মানুষের চোখে-মুখে

ছিল আনন্দ আর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসানের স্বস্তি। অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত জনতার বিপ্লবের এই স্মৃতিবিজড়িত প্রাঙ্গণ অবশেষে উন্মুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য।

বিজ্ঞাপন

একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শেখ হাসিনার নির্মমতার সাক্ষী হয়ে থাকা এই গণভবন এখন রূপ নিয়েছে ‘জুলাই ৩৬ গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে’। মানবতাবিরোধী অপরাধের নানা অভিযোগ মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনার পলায়নের দুই বছর পূর্তিতে ১৭ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই জাদুঘরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনের পর থেকেই সাধারণ মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক এই প্রাঙ্গণ।

সবুজ চত্বর ও প্রাঙ্গণের রূপ

জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল সুবিশাল সবুজ চত্বর। বৃষ্টিস্নাত দিনে পথের দুই পাশে গাছপালা, সবুজ ঘাস এবং জলাধার মিলিয়ে চারপাশের মনোরম পরিবেশ বেশ স্নিগ্ধ লাগছিল। কিছুটা সামনে এগিয়ে দেখা মিলল জুলাই বিপ্লবে নিহত কয়েক তরুণের ভাস্কর্য। লাল ইটের তৈরি ঐতিহ্যবাহী ভবন, গাছপালা এবং ইট বিছানো পথ ধরে এগিয়ে চললাম। পার্কের বিভিন্ন জোনের দিকনির্দেশনা সংবলিত কালো রঙের সাইনবোর্ডে উল্লেখ রয়েছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর, নামাজের স্থান, ক্যাফে এবং চিলড্রেনস প্লে ফিল্ডের নাম। সাইনবোর্ডগুলোয় জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আলোকচিত্র, গ্রাফিতি এবং আন্দোলনের বিভিন্ন মুহূর্তের বিবরণ প্রদর্শিত হচ্ছে।

বিভিন্ন কাঠামোর বহির্দেয়ালে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় প্রচুর গ্রাফিতি ও স্প্রে-পেইন্ট করা স্লোগান দেখা গেল, যা এখনো আগুনঝরা সেই দিনগুলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। উন্মুক্ত প্রদর্শনীর স্ট্যান্ডগুলোতে ছবিযুক্ত প্যানেল এবং বিভিন্ন গণবিক্ষোভের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

প্রতীকী ভাস্কর্য ও স্মৃতিফলক

মাঠজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের মর্মান্তিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর প্রতীকী ভাস্কর্য। এর মধ্যে রয়েছে রিকশায় গুলিবিদ্ধ লাশ, সাঁজোয়া যানে ঝুলে থাকা আন্দোলনকারী, সাইকেল নিয়ে মিছিলে যাওয়া স্কুলছাত্রীসহ বিভিন্ন প্রতীকী অবয়ব। অভ্যুত্থানের বিভিন্ন চরিত্রের প্রতীকী ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক দর্শনার্থী ও সংবাদকর্মী ছবি তুলছিলেন এবং ভিডিও ধারণ করছিলেন। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে লাল টেলিফোনের সামনে ছিল প্রচণ্ড ভিড়, যেখানে তারা শুনছিল সেদিনের বিভিন্ন কথাবার্তা। সাধারণ মানুষ স্বৈরাচারের জুলুমের ছবি ও ‘আয়নাঘর’-এর প্রতিকৃতির সামনে ছবি তুলছিলেন।

পার্কের খোলা চত্বরে পানির ফোয়ারার পাশাপাশি দেখা মিলল একটি সাদা রঙের রিকশায় চালক ও যাত্রীর প্রতীকী ভাস্কর্য এবং পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া একজন ছাত্রীর ভাস্কর্য।

প্রধান ফটকের পাশেই নানা ফলের বাগান ও ‘গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা’ শিরোনামের বিশেষ প্যানেল। এর পাশে দক্ষিণ দিকের সবুজ মাঠে তৈরি করা হয়েছে ‘জুলাই মেমোরিয়াল’। সাদা মার্বেল পাথরের বৃত্তাকার এই মেমোরিয়ালে বিগত শাসনামলে খুন হওয়া শহীদদের নাম উৎকীর্ণ রয়েছে। মাঠের ভেতরের অংশটি সবুজ ঘাসে ঢাকা সারি সারি প্রতীকী কবরের মতো তৈরি করা হয়েছে।

দর্শনার্থীদের অনুভূতি

পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রথমবারের মতো জাদুঘরে এসে দারুণ মুগ্ধতা প্রকাশ করেন সরকারি কর্মকর্তা জিয়াউল হক। তিনি জানান, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এবং পরবর্তী সময় পর্যন্ত ইতিহাস যেভাবে সুশৃঙ্খল ও জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা তার ধারণার বাইরে ছিল। নিজের দেখা ঐতিহাসিক ঘটনার পাশাপাশি এই প্রদর্শনী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস জানার এক দারুণ সুযোগ তৈরি করেছে।

সিরাজগঞ্জ থেকে অফিসের কাজে ঢাকায় এসে এই সুযোগে জাদুঘর ঘুরে দেখছিলেন সাদাত চৌধুরী রাফি। ৫০ টাকার প্রবেশমূল্য সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুলভ বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ দর্শনার্থী মোহাম্মদ আব্দুলও তার অত্যন্ত আনন্দিত ও ইতিবাচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।

গুম, খুন ও নির্যাতনের দলিল নিচতলায়

মূল ভবনের নিচতলায় স্থান পেয়েছে বিগত সরকারের গুম, খুন ও নির্যাতনের ভয়াবহ ইতিহাস। উত্তর দিক দিয়ে প্রবেশের পরই বড় কক্ষে রাখা ডিসপ্লে মনিটরে ভেসে উঠছে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ভিডিও। ঐতিহাসিক ‘কল রুম’-এর মেঝের ভাঙচুর ও ক্ষতের চিহ্ন অবিকৃত রাখতে তা বিশেষ কাচ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আয়নাঘরে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক শক দেওয়ার যন্ত্র, চাবুক, বৈদ্যুতিক চেয়ারসহ নানা নির্যাতনের সরঞ্জাম রাখা রয়েছে এখানে। পাশাপাশি ক্রসফায়ার ও আর্থিক লুটপাটের প্রমাণের গোপন নথিপত্র এবং বহুল আলোচিত লাল টেলিফোনও দর্শনার্থীরা দেখতে পেয়েছেন।

দোতলায় শহীদের স্মারক

জাদুঘরের দোতলাটি সাজানো হয়েছে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্ত ও শহীদদের স্মারক দিয়ে। পলাতক প্রধানমন্ত্রীর শয়নকক্ষের ভাঙচুর করা বিছানায় পেতে রাখা হয়েছে শহীদের রক্তমাখা শার্ট, গেঞ্জি ও প্যান্ট। এছাড়া দোতলার বিশেষ ‘ইমার্সিভ প্রজেক্ট রুমে’ ডিজিটাল প্রজেক্টর ও ৩৬০ ডিগ্রি স্ক্রিনের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের ঘটনাগুলো এমনভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীদের মনে হয় তারা সরাসরি আন্দোলনের ভেতরেই অবস্থান করছেন। শহীদদের বই-খাতা, পোশাক এবং শত শত স্মৃতিচিহ্ন এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে।

সময়সূচি ও টিকিটের তথ্য

দর্শনার্থীদের শৃঙ্খলা ও স্থান সংকুলানের কথা মাথায় রেখে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক দর্শনার্থী মূল ভবনে প্রবেশের অনুমতি পাবেন। পরিদর্শনের সময় নির্ধারিত হয়েছে তিনটি শিফটে—বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা, দুপুর ১টা থেকে বেলা ৩টা এবং শেষ পর্ব বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা।

বড়দের জন্য টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২০ টাকা। সরাসরি জাদুঘরের কাউন্টার কিংবা অনলাইনের মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করা যাবে। তবে মূল ভবন দেখা শেষে মাঠে ঘোরাঘুরি, পুকুরপাড় বা ক্যাফেটেরিয়ায় সময় কাটানোর ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতা কাটিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’কে রূপান্তর করে এই ঐতিহাসিক জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এর মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের গৌরবময় স্মৃতি এবং শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণটি সবার জন্য উন্মুক্ত হলো।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন