দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে হবে খেলার মাঠ

দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে হবে খেলার মাঠ

তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার বিকাশ, শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা এবং যুবসমাজকে মাদক, কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রাখতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে আধুনিক খেলার মাঠ গড়ে তোলার মেগা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।

বিজ্ঞাপন

ইতোমধ্যে দেশের চার হাজার ৪৯৯টি ইউনিয়নে খেলার মাঠ নির্মাণ বা বিদ্যমান মাঠ সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করতে সংসদ সদস্যদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। প্রতিটি ইউনিয়নে ন্যূনতম আট বিঘা জমি নির্ধারণ করে সেখানে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, দেশের অধিকাংশ গ্রামীণ এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূমির সংকটে খেলার মাঠ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ফলে শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে মোবাইল আসক্তি, মাদক, কিশোর অপরাধ এবং বিভিন্ন সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার ইউনিয়নভিত্তিক মাঠ নির্মাণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক ফুটবলার সাব্বির আহমেদ আমার দেশকে বলেন, বর্তমান যুব ও তরুণ সমাজ যেভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে, তাদের রক্ষার জন্য সরকারের এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। এ ক্ষেত্রে শুধু মাঠ করলেই হবে না, মাঠের অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণে পরিকল্পনা থাকতে হবে।

এ বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক আমার দেশকে বলেন, খেলাধুলার সার্বিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত মাঠের বিকল্প নেই। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমাকে।

তিনি আরো বলেন, কমিটিতে স্থানীয় সরকার ও গৃহায়ন প্রতিমন্ত্রীসহ ১২ জন সচিব সদস্য হিসেবে রয়েছেন। তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ঢাকাসহ সারা দেশে মাঠ সংরক্ষণ, সংস্কার এবং নতুন খেলার মাঠ নির্মাণের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে আধা সরকারি (ডিও) পত্র পাঠিয়ে নিজ নিজ এলাকায় অন্তত আট বিঘা জমি নির্ধারণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এসব জায়গায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন খেলার মাঠ নির্মাণের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে।

আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়নের প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কৃষিজমি রক্ষা করে হবে মাঠ

সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যেখানে কোনো খেলার মাঠ নেই, সেখানে নতুন মাঠ নির্মাণের জন্য কোনোভাবেই কৃষিজমি নষ্ট করা যাবে না। কৃষিজমি সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থান অথবা গ্রোথ সেন্টারের কাছে খাসজমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হবে।

যেভাবে হবে মাঠের নকশা

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাঠগুলো প্রধানত উন্মুক্ত খেলার মাঠ (ওপেন প্লে গ্রাউন্ড) হিসেবে গড়ে তোলা হবে। যাতে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, কাবাডি এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো আয়োজন করা যায়।

মাঠের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মাঠের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শক্রমে ব্যবস্থাপনা কাঠামো বা রক্ষণাবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হবে।

আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ

নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছরে দেশের আটটি বিভাগ এবং ফরিদপুর ও কুমিল্লাসহ ১০টি অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এসব স্পোর্টস ভিলেজে থাকবে আধুনিক ইনডোর স্টেডিয়াম, সুইমিং পুল, আর্চারি, শুটিং, ফুটবল, অ্যাথলেটিক্সসহ বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ-সুবিধা।

পাঠ্যক্রমে ক্রীড়া শিক্ষা

শিশু-কিশোরদের মানসম্মত শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সরকার ইতোমধ্যে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচি চালু করেছে। পাশাপাশি চতুর্থ শ্রেণি থেকে পাঠ্যক্রমে ক্রীড়া শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনিয়নভিত্তিক মাঠ এবং আধুনিক স্পোর্টস ভিলেজ বাস্তবায়িত হলে এসব উদ্যোগ আরো কার্যকর হবে।

উপজেলায় ক্রীড়া কর্মকর্তা থাকবে

সরকার দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আরো গতিশীল ও তৃণমূলভিত্তিক করতে প্রতিটি উপজেলায় ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ক্রীড়া ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আসবে এবং তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগ হলে গ্রামাঞ্চলের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের সহজেই চিহ্নিত করে বিকেএসপি ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ভলিবল, অ্যাথলেটিক্সসহ বিভিন্ন খেলাধুলার প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে।

এ উদ্যোগের ফলে মাঠ দখল, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা কমার পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দের ক্রীড়াসামগ্রী প্রকৃত খেলোয়াড়দের কাছে পৌঁছানোও নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে প্রাণবন্ত ক্রীড়া কার্যক্রম গড়ে উঠলে তরুণ সমাজ মোবাইল আসক্তি, মাদক এবং কিশোর অপরাধ থেকে দূরে থাকবে। নিয়মিত শরীরচর্চা ও সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে গড়ে উঠবে একটি স্বাস্থ্যবান ও সৃজনশীল যুবসমাজ।

নারী ক্রীড়াবিদদের জন্যও এ উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মতো বিশেষজ্ঞদের। উপজেলা পর্যায়ে সরকারি তদারকি জোরদার হলে অভিভাবকদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের জন্য আরো নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত হবে।

এছাড়া ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অনুদান, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা দ্রুত মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ক্রীড়া ক্লাবগুলো বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও স্পন্সরশিপ অর্জনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সমন্বিত সহায়তা পাবে।

সরকারের ক্রীড়াবান্ধব নীতি

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইউনিয়নভিত্তিক খেলার মাঠ, উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ, পাঠ্যক্রমে ক্রীড়া শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি এবং নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস কর্মসূচি—সব মিলিয়ে সরকার দেশের ক্রীড়া খাতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়নের সমন্বিত রূপরেখা বাস্তবায়ন করছে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরির পথই সুগম হবে না, বরং তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যবান, শৃঙ্খলাবোধসম্পন্ন, মাদকমুক্ত ও উৎপাদনশীল নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ক্রীড়া সংস্কৃতির বিস্তার ঘটবে এবং স্থানীয় পর্যায় থেকেই আন্তর্জাতিক মানের প্রতিভা তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন