চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের ইতিহাসে কয়েকটি নাম সময়ের সঙ্গে আলোচিত হয়ে আছে। নব্বইয়ের দশকে শিবির ক্যাডার নাছিরের আধিপত্য ছিল সবচেয়ে বেশি। পরে গিট্টু নাছির, ফাইভ স্টার জসিম, আজরাইল দেলোয়ার ও হাবিব খানের মতো ব্যক্তিরা অপরাধ জগতে প্রভাব বিস্তার করেন। একে একে ক্রসফায়ার, গ্রেপ্তার, দলাদলি কিংবা বিদেশে পলায়নের কারণে পুরোনো আন্ডারওয়ার্ল্ড দুর্বল হয়ে পড়লে নীরবে উঠে আসে আরেকটি নাম—সাজ্জাদ আলী খান, যিনি পরে ‘বড় সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত হন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, হাটহাজারী ও রাউজান এলাকায় সংঘটিত বহুল আলোচিত হত্যা, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার বাহিনীর নাম এসেছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) নথিতে তিনি ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। পুলিশের দাবি, শুধু ২০২৫ সালেই তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ৯টি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংঘটিত অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডেও তার বাহিনীর সদস্যদের নাম এসেছে। তবে সাজ্জাদ আলী খান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার দাবি, আওয়ামী লীগই তার জীবন ধ্বংস করেছে। তিনি কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িত নন।
ছাত্রদল থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে
সাজ্জাদ আলী খানের বাড়ি চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর চালিতাতলী এলাকায়। তার বাবা ছিলেন একজন ঠিকাদার। নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৯৮ সালে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলে যোগ দেন। দীর্ঘদিন ধরে তাকে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত করা হলেও তিনি তা অস্বীকার করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি বা জামায়াতের কোনো কর্মীকে তিনি কখনো হত্যা করেননি, ভবিষ্যতেও করবেন না।
তবে পুলিশের নথির তথ্য ভিন্ন। ২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে আটজন নিহত হওয়ার আলোচিত ব্রাশফায়ার মামলায় তাকে আসামি করা হয়। ২০০৮ সালে নিম্ন আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং রায়ে তাকে শিবির সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৪ সালে উচ্চ আদালতে তিনি খালাস পান। সাজ্জাদের দাবি, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না।
নাছিরের পতনের পর উত্থান
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ছিলেন শিবির ক্যাডার নাছির। অস্ত্র, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির বড় অংশই নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। সেই বাহিনীর সক্রিয় তরুণ সদস্যদের একজন ছিলেন সাজ্জাদ।
১৯৯১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে নাছির বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ক্রসফায়ার, প্রতিপক্ষের হামলা, গ্রেপ্তার কিংবা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার কারণে ছিটকে পড়েন। কিন্তু টিকে যান সাজ্জাদ এবং ধীরে ধীরে নাছিরের অনুসারীদের একটি বড় অংশ তার নেতৃত্বে চলে আসে। এরপরই ‘সাজ্জাদ গ্রুপ’ নামে একটি নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন কারাভোগের পর শিবির নাছির ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মুক্তি পান। বর্তমানে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। সম্প্রতি আমার দেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার কোনো শত্রু নেই এবং তার নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তবে সাজ্জাদ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
একাধিক আলোচিত মামলায় নাম
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সংঘটিত একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী ঘটনায় সাজ্জাদের নাম উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে যুবলীগ কর্মী শ্যামল, জাফর ও দিদার হত্যা, ওমরগণি এমইএস কলেজের ছাত্রলীগ নেতাদের টার্গেট কিলিং, ওয়ার্ড কমিশনার লিয়াকত আলী খান হত্যা, বহদ্দারহাট ব্রাশফায়ার, ছাত্রলীগ নেতা আবুল কাশেম ও আবু তাহের হত্যা, সাবেক বন্দর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম রাব্বানী হত্যা এবং কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলে ৫৬ লাখ টাকা লুটের ঘটনা। তবে এসব অভিযোগের অধিকাংশই তিনি অস্বীকার করেছেন। লিয়াকত আলী খান হত্যা মামলার বিষয়ে তার দাবি, সরকারি নথি অনুযায়ী তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বা ১৪ বছর। ওই বয়সে এমন হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়।
বিদেশে থেকেই সক্রিয় নেটওয়ার্ক
২০০২ সালে দেশ ছাড়েন সাজ্জাদ। প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকা, পরে দুবাই এবং এরপর ভারতে অবস্থান করেন। বর্তমানে তিনি পরিবার নিয়ে দুবাইয়ে বসবাস করছেন বলে দাবি করেন। তিনি ভারতীয় এক নারীকে বিয়ে করেছেন বলেও জানান। তবে সিএমপির দাবি, বিদেশে থাকলেও অনলাইন কল, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ও বিশ্বস্ত সহযোগীদের মাধ্যমে তিনি এখনো চট্টগ্রামের অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণ করেন।
জামিননির্ভর কিলার নেটওয়ার্ক
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাজ্জাদের নেটওয়ার্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ছোট অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া তরুণদের জামিনে মুক্ত করে ধাপে ধাপে সংঘবদ্ধ অপরাধে যুক্ত করা।
তাদের দাবি, প্রথমে নজরদারি, মোটরসাইকেল চালানো ও অস্ত্র বহনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে অস্ত্রচালনা ও টার্গেট কিলিংয়ের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের ‘হিটম্যান’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, বর্তমানে আলোচিত রায়হান আলম, ছোট সাজ্জাদ, মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন, বোরহান উদ্দিন এবং শহিদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যাসহ কয়েকজন একই প্রক্রিয়ায় সংগঠনে যুক্ত হয়েছেন।
সিএমপির সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ আমার দেশকে বলেন, ছোটখাটো অপরাধে কারাগারে যাওয়া ব্যক্তিদের মুক্তির পরও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। সাজ্জাদের হয়ে কারা কাজ করছে এবং তিনি কাদের সংগঠনে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন, সেসব বিষয়ও পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এখন এক ধরনের ‘রিসাইকেল সিস্টেম’ গড়ে উঠেছে। ছোট অপরাধে গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বের হওয়া অনেক তরুণ পরে পেশাদার কিলারে পরিণত হচ্ছে। এই চক্র ভাঙা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আশরাফ হোসেন চৌধুরীর মতে, দুর্বল তদন্ত ও চার্জশিটের কারণে অনেক আসামি দ্রুত জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসে এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তিনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও টেকসই মামলা পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নতুন নেতৃত্ব ও পুলিশের তৎপরতা
পুলিশের দাবি, বর্তমানে সাজ্জাদের বাহিনী চট্টগ্রামের অন্তত পাঁচটি থানা এলাকায় সক্রিয়। বিদেশে অবস্থান করেও তিনি হত্যার নির্দেশ দেন। তবে সাজ্জাদ সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া চাঁদাবাজির অডিওকে সাজ্জাদ ‘এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ও সম্পাদিত’ বলে দাবি করেছেন।
২০০০ সালের পর তার বাহিনীর প্রথম সারিতে ছিলেন নুরনবী ম্যাক্সন, সরওয়ার হোসেন (পরে সরওয়ার বাবলা) ও আকবর আলী। পরবর্তী সময়ে গিট্টু মানিকসহ আরো কয়েকজন এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হন। বর্তমানে ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন, রায়হান আলম, বোরহান উদ্দিন ও বুইস্যাকে বাহিনীর সক্রিয় সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হয়েছেন, ছোট সাজ্জাদ কারাগারে রয়েছেন এবং রায়হান আলম ও বোরহান পলাতক বলে জানিয়েছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এসপি মাসুদ আলম বলেন, পুরোনো সদস্য নিহত, গ্রেপ্তার বা দলত্যাগ করলে তাদের জায়গায় নতুন সদস্যদের আনা হতো। প্রথমে তথ্য সংগ্রহ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন, পরে চাঁদাবাজি, অস্ত্র বহন এবং শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
সিএমপি কমিশনার হাসান শওকত আলী জানিয়েছেন, সাজ্জাদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে আবেদন করা হয়েছে। দেশে ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি করা হবে।
প্রায় তিন দশক ধরে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত এই নামটি এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় রয়েছে। পুলিশের দাবি, বিদেশে অবস্থান করলেও তার অপরাধী নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



