গালি ও বিদ্রূপে ভ্যান্সের ‘ট্রল’ রাজনীতি

গালি ও বিদ্রূপে ভ্যান্সের ‘ট্রল’ রাজনীতি
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আবারও আলোচনায় এসেছেন তার আক্রমণাত্মক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আচরণের কারণে। সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটাক্ষ ও বিদ্রূপের ভাষা ব্যবহার করছেন তিনি। এমনকি এক রক্ষণশীল কলাম লেখকের শারীরিক গঠন নিয়েও মন্তব্য করেছেন।

ইরান ইস্যুতে ভ্যান্সের অবস্থানের সমালোচনা করেছিলেন রক্ষণশীল কলাম লেখক মার্ক থিয়েসেন। এর কয়েক দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য করেন ভ্যান্স।

বিজ্ঞাপন

এক পোস্টে থিয়েসেন লিখেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবারের তালিকায় বুরিটো থাকলে দাম নিয়ে অভিযোগ করার প্রয়োজন নেই। এর জবাবে ভ্যান্স ইঙ্গিত করেন, থিয়েসেন হয়তো ক্যাফেটেরিয়ায় একাধিকবার বুরিটো নিয়েছেন।

ভ্যান্সের এই মন্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়। কেউ কেউ থিয়েসেনের পক্ষ নেন। তারা ভ্যান্সের নিজের ওজন কমানোর বিষয়টিও তুলে ধরেন। ভ্যান্সের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিনি প্রায় ৩০ পাউন্ড ওজন কমিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আক্রমণ নতুন নয়। তবে কোনো বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এ ধরনের সরাসরি শারীরিক কটাক্ষ বিরল।

সমালোচকদের ছাড় দেন না ভ্যান্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই সরাসরি ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করে আসছেন। তার আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছেন বামপন্থি সমালোচক থেকে শুরু করে নিজ দলের রক্ষণশীলরাও।

সমালোচকদের তিনি ‘বোকা’, ‘অযোগ্য’ বা ‘লজ্জাজনক’ বলেও মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য শুধু নীতির পার্থক্য নয়; অনেক সময় প্রতিপক্ষকে তিনি অসৎ বা অযোগ্য হিসেবেও তুলে ধরেন।

সাংবাদিকদেরও আক্রমণ করেছেন ভ্যান্স। এবিসি নিউজের সাবেক প্রতিবেদক টেরি মোরানকে তিনি ‘বামপন্থি উগ্রবাদী’ বলে মন্তব্য করেন।

জিউইশ ইনসাইডারের সাংবাদিক জশ ক্রুশার সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি হয় ‘ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিক’, নয়তো ‘সবচেয়ে বোকা সাংবাদিক’।

নিজ দলের সমালোচকদেরও ছাড় দেননি তিনি। ইরান নীতি নিয়ে মন্তব্য করায় ডেভিড রিবোইকে তিনি ‘লুজার’ বলেন।

ডানপন্থি প্রভাবশালী লরা লুমারের সমালোচনা করে বলেন, তিনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে বিভেদ তৈরি করছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া ভাষা

ভ্যান্সের ভাষা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় তার সরাসরি আক্রমণ ও কটু শব্দ ব্যবহারের কারণে।

এক পডকাস্টারের মন্তব্যের জবাবে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি এই আত্মবিশ্বাসী ও অহংকারী বাজে কথাকে ঘৃণা করি।’

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনে ট্রাম্প ও জেফ্রি এপস্টেইন সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশের পর ভ্যান্স সেটিকে ‘সম্পূর্ণ বাজে কথা’ বলে মন্তব্য করেন।

স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিষয়ক মন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রকে নিয়ে সিনেটরদের প্রশ্নের সমালোচনা করে তিনি লেখেন, আপনারা মিথ্যা বলছেন এবং সবাই তা জানে।’

পুরোনো রাজনৈতিক শিষ্টাচার থেকে আলাদা

ভাইস প্রেসিডেন্টরা ঐতিহাসিকভাবে অনেক সময় সরকারের আক্রমণাত্মক মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছেন। তবে সাধারণত তারা ব্যক্তিগত অপমানের ভাষা এড়িয়ে গেছেন।

আধুনিক যুগের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনেকেই স্পাইরো টি. অ্যাগনিউর নাম উল্লেখ করেন। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সময়ে তিনি সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করতেন।

তবে অ্যাগনিউয়ের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। ফলে তার বক্তব্য এত দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও ছিল না।

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে যথেষ্ট সংযত ছিলেন।

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির যোগাযোগ পরিচালক কেভিন কেলেমস বলেন, ‘এটি এমন আচরণ, যা ওই পদের সঙ্গে মানানসই নয়।’

তার মতে, ভ্যান্সের আচরণ অনেকটা এমন, যেন তিনি জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য তরুণদের মতো আক্রমণাত্মক প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের যোগাযোগ পরিচালক জামাল সিমন্স বলেন, ভ্যান্স হয়তো ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়ার জন্য নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করছেন।

সমর্থকদের দাবি, এটি ‘খোলামেলা রাজনীতি’

ভ্যান্সের সহযোগী ও সমর্থকেরা অবশ্য বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন।

তাদের দাবি, ভ্যান্স সাধারণ মানুষের মতো সরাসরি কথা বলেন। রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রচলিত ভদ্রতার বাইরে গিয়ে তিনি মানুষের বাস্তব উদ্বেগ তুলে ধরছেন।

ভ্যান্স নিজেও বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে সাধারণ মানুষের ‘ফিল্টারহীন ও বাস্তব মতামত’ শোনার সুযোগ দেয়।

গত বছরের শুরুতে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটি তার প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য। প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্মের মানুষ হিসেবে তিনি সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে বিশ্বাস করেন।

তবে ভ্যান্স নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে সতর্ক ছিলেন। চলতি বছরের মে মাসে তিনি জানান, ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ হিসেবে কিছুদিনের জন্য এক্স অ্যাপ ফোন থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন।

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকার সময় তিনি বেশি মনোযোগী ও উৎপাদনশীল ছিলেন।

অন্য জায়গায় ভিন্ন ভ্যান্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক হলেও অন্য অনেক জায়গায় ভ্যান্স তুলনামূলক সংযত আচরণ করেন।

জুন মাসে প্রকাশিত তার বই Communion-এ নিজের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় যাত্রার কথা তুলে ধরেছেন। সেখানে ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান থেকে নাস্তিকতা এবং পরে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন তিনি।

বইটির প্রচারে তিনি এবিসির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য ভিউ’-তে অংশ নেন। সেখানে মূলত উদারপন্থি উপস্থাপকদের সঙ্গে তার আলোচনা ছিল তীব্র, তবে ভদ্র।

অনুষ্ঠানের উপস্থাপক জয় বেহার পরে বলেন, ভ্যান্সের রসবোধ রয়েছে। মতপার্থক্য থাকলেও তিনি মনে করেন, ২০২৮ সালে ভ্যান্স প্রেসিডেন্ট হলে হয়তো আরো নমনীয় হতে পারেন।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব?

বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যান্সের এই আচরণ অনেকটা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে মিল রয়েছে।

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধু ও শত্রু—দুই পক্ষকেই আক্রমণ করে আসছেন। তবে ভ্যান্সের বিশেষত্ব হলো, তিনি সমালোচকদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনে জড়িয়ে পড়েন।

গত বছর নিজের এক সহযোগী বাকলি কার্লসনকে নিয়ে আক্রমণের জবাবে ভ্যান্স লিখেছিলেন, তিনি মতপার্থক্য সহ্য করতে পারেন। কিন্তু তার কর্মীদের নিয়ে মিথ্যা আক্রমণ তিনি সহ্য করবেন না।

ভ্যান্স থামছেন না

ধর্মীয় কারণে কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকলেও এখন আবার সক্রিয় হয়েছেন ভ্যান্স।

মার্ক থিয়েসেনকে নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্য দেখিয়েছে, আগের মতোই তিনি সমালোচকদের সরাসরি জবাব দিতে প্রস্তুত।

সমালোচনা থাকলেও ভ্যান্সের রাজনৈতিক কৌশলের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে এই সরাসরি, সংঘাতমুখী যোগাযোগ।

আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই আক্রমণাত্মক উপস্থিতি যে সহজে থামছে না, তা স্পষ্ট।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন