রাজধানীসহ দেশের সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ স্কুলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক শিক্ষক নিয়মিত ও কার্যকরভাবে ক্লাস নেন না। নানা অজুহাতে শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকা কিংবা দায়সারাভাবে পাঠদান করে শুধু সিলেবাস শেষ করার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে পারছে না। তবে শ্রেণিকক্ষে অনীহা থাকলেও অনেক শিক্ষককে প্রাইভেট ও কোচিংয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদেরও এসব কোচিং বা প্রাইভেটে যেতে উৎসাহিত কিংবা বাধ্য করা হয়।
ফলে শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি পূরণে শিক্ষার্থীদের কোচিং, প্রাইভেট বা গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এতে একদিকে অভিভাবকদের আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় পড়াশোনার চাপে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার প্রতি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহও কমে যাচ্ছে। নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ের ব্যবহারও বন্ধ হয়নি।
পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে ক্লাসে পড়ালেখার মান অত্যন্ত নিম্নমুখী হওয়ায় অভিভাবকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কোচিং-বাণিজ্যবিরোধী একটি নীতিমালা করা হয়। দীর্ঘ এক যুগেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্লাসের মান বৃদ্ধিসহ শিক্ষার উন্নয়নে নানা কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে বর্তমান সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় অনলাইনে ক্লাস মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে সরাসরি তদারকি জোরদার না হলে শুধু অনলাইন মনিটরিং কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। একই সঙ্গে তারা কোচিংবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইন প্রণয়নেরও দাবি জানান।
শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ
শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের অভাব, শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক সংকট, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দূরত্ব, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অপর্যাপ্ত বাজেট—এসব কারণে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ২০২১ সালের ‘সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান : চাহিদা এবং শিক্ষা প্রদানের মধ্যে শূন্যতা’ শীর্ষক জরিপে দেখা যায়, সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট সেবা থেকে বঞ্চিত। প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা না পেয়ে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। চড়া মূল্যে কোচিং সেন্টার থেকে শিক্ষা কিনছে তারা। কিন্তু সেখানেও মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাব রয়েছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, ক্লাসে ভালো পড়ালেখার জন্য শিক্ষকদের অনেক দায় ও দায়িত্ব আছে। শিক্ষকদের বেতনের বিনিময়ে যে দায়িত্ব পালন করার কথা, সেখানে কোনো ঘাটতি থাকা উচিত নয়। সরকারের কার্যকর মনিটরিংয়ের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে অভিভাবকদের খোঁজখবর রাখা এবং প্রয়োজন হলে শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
অভিভাবকদের অভিযোগ
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, তেজগাঁও সরকারি হাইস্কুল, আজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বক্তব্যে একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। যদিও বিশেষায়িত ও কিছু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে তুলনামূলকভাবে পাঠদানের মান ভালো বলে জানা গেছে। অন্যদিকে কওমি ও আলিয়া মাদরাসায় পাঠদানের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সেখানে প্রাইভেট-কোচিংবাণিজ্যের তেমন প্রভাব দেখা যায় না।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পড়ালেখার মান ও অনুপস্থিতির কারণে জরিমানা আদায়ের সমালোচনা করে সারওয়ার খান কাওসার নামের এক অভিভাবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এমন দিনই বিরল, যেদিন সব ক্লাস হয়। শিক্ষক দেরিতে আসেন, নানা অজুহাতে ক্লাসের সময় নষ্ট হয়, কখনো ক্লাসই বাতিল হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের হারিয়ে যাওয়া শেখার ক্ষতির জন্য জরিমানা কার?
খুলনার একটি স্বনামধন্য স্কুলের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের চেয়ে বাইরে প্রাইভেট পড়াতে বেশি আগ্রহী। ক্লাসে তড়িঘড়ি করে সিলেবাস শেষ হলেও শিক্ষার্থীরা তা আয়ত্ত করতে পারে না। ফলে তাদের জন্য প্রাইভেট, কোচিং বা হাউস টিউটর জরুরি হয়ে পড়ে।তেজগাঁও সরকারি হাইস্কুলের তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের ভাষ্য, স্কুলে নামমাত্র ক্লাস হয়। পড়ালেখা সব নিজ উদ্যোগেই করতে হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের কাছে সন্তানদের প্রাইভেট পড়াতে অনেকটা বাধ্য হন অভিভাবকরা।
বাস্তবায়ন হয়নি কোচিং নীতিমালা
কোচিংবাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বন্ধে ২০১১ সালে হাইকোর্টে একটি রিট করেন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিংবাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ করে সরকার।
নীতিমালায় সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিষ্ঠানপ্রধানের লিখিত অনুমতি নিয়ে দিনে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানোর সুযোগ রাখা হলেও এ নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন আজও দৃশ্যমান হয়নি।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি আমার দেশকে বলেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষকদের কোচিং-প্রাইভেট বন্ধে কঠোর আইন করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি মনিটরিং ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। তা না হলে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার মান উন্নয়নে যতই দৌড়ঝাঁপ করুন না কেন, তার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। মাউশির অনলাইন মনিটরিংয়ের উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, বাস্তবেই যেখানে মনিটরিং হয় না, সেখানে অনলাইন মনিটরিংয়ের ফল কতটুকু পাওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম আমার দেশকে বলেন, ভালো পড়ালেখার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং বাসায় অভিভাবকদের গাইড লাইনের প্রয়োজন আছে। তিনি জানান, করোনাপরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে। অনেক অভিভাবকও বাসায় ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার প্রয়োজনীয় গাইডলাইনে সময় দিতে পারেন না । তিনি ক্লাসের প্রতি আস্থা রেখে শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী না হওয়ার আহ্বান জানান। তবে শিক্ষকদের কোচিং-প্রাইভেটের কারণে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি কমছে—এমন অভিযোগের বিষয়েও নজর দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনলাইন মনিটরিংয়ের উদ্যোগ
গত ১০ জুলাই মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক জরুরি চিঠিতে অধিদপ্তরের আওতাধীন সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেন্ট্রাল অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে গুগল ফর্মে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সময়মতো তথ্য না দিলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে তিনি আমার দেশকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষার মান উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরই অংশ হিসেবে ক্লাস অনলাইন মনিটরিংয়ের এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিস কর্মকর্তাদেরও সক্রিয় করাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে শিক্ষার উন্নয়নে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় শিক্ষার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাজেটে শিক্ষায় জিডিপির দুই শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আনন্দময় শিক্ষার জন্য কারিকুলাম পরিমার্জন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিবিষয়ক দুটি বই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষা খাতে সমস্যা দীর্ঘদিনের আর আমাদের পরিকল্পনা পাঁচ বছরের। তাই সব সমস্যার সমাধান বা সব উন্নয়ন একবারে সম্ভব নয়। এজন্য আমরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছি।
এদিকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে সম্মানী বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে করা প্রশ্নের জবাবে তিনি এ ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি বলেন, স্বৈরাচার সরকারের সময় শুধু বিল্ডিং হয়েছে, কিন্তু হিউম্যান রিসোর্সের কোনো উন্নতি হয়নি। আমরা যদি প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি শিক্ষকদের সঠিকভাবে ট্রেনিং দিতে না পারি, ট্রেনিংয়ের সঙ্গে তাদের সম্মানী যদি বৃদ্ধি করতে না পারি, তাহলে আমরা তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা করতে পারি না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

