বাংলাদেশেও রাজনৈতিক হত্যায় ভারতের সম্পৃক্ততা

আবু সুফিয়ান

বাংলাদেশেও রাজনৈতিক হত্যায় ভারতের সম্পৃক্ততা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং এতে ভারতের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক মন্তব্য আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। যদিও তিনি সরাসরি কারো নাম উল্লেখ করেননি, তবে তার ইঙ্গিতপূর্ণ এ বক্তব্য তরুণ রাজনীতিবিদ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দিকেই আঙুল তুলছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) বিরুদ্ধে বিদেশের মাটিতে গুপ্তহত্যার অভিযোগের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মমতার এ মন্তব্য ভারত সরকারের বৈদেশিক নীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘অন্য একটি দেশে নির্বাচন হয়েছে এবং সেখানে পরাজিত এক নেতা কী বললেন, সেটি আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। তবে ভারত সরকার যদি ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য শেয়ার করে, তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। এ ব্যাপারে আমাদের কাজ ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ও সিরিয়াসলি কাজ করছে।’

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম তার ফেসবুকে লেখেন, ‘এর আগে বলেছিলেন প্রণব মুখার্জি, এবার ইঙ্গিতে বললেন মমতা ব্যানার্জি। এটা বন্ধু রাষ্ট্র হলে শত্রু রাষ্ট্র কেমন হবে?’

এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব এবং বর্তমানে ‘গণবিপ্লবী উদ্যোগ’-এর প্রতিনিধি আরিফ সোহেল বলেন, ‘ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাবশালী ভূমিকার কারণে তার প্রতিটি পদক্ষেপ বা মন্তব্য বেশ গুরুত্ব বহন করে।

কিন্তু বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশই যেকোনো মূল্যে পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক বা নরমালাইজ করার নীতি অনুসরণ করছে। এই রাষ্ট্রীয় পলিসির কারণেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’

মমতার মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

মমতা যা বলেছেন

তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতা হারানোর প্রায় এক মাস পর গত মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে মমতা ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ অভিযোগ তোলেন।

মমতা বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে একটি বড় খুনিকে এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল, যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভল্যুশন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না, আমার বলার অধিকার নেই। কিন্তু আমি যেটা বলছি পয়েন্টটা, তার পরে তারা মেঘালয়ে গিয়ে বাংলায় চলে আসে। বাংলায় যখন চলে আসে, তখন আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে—এটা তাদের ক্রেডিট।’

তিনি আরো দাবি করেন, ‘তারপর হোম মিনিস্টার নিজে আমাকে ফোন করে বলেছেন। কই এতদিন তো আমি বলিনি, মুখ করিনি। আজ অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছেন বলে, কারণ এটা জানে আমি এখনো নামটা বলছি না। ভদ্রতা করে, বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে, আমি সেটা চাই না। আমি দেশকে ভালোবাসি, নামটা বলব না।’

মমতা সরাসরি কোনো নাম উল্লেখ না করলেও দাবি করেন, ‘দেশের স্বার্থে আমি এটা করছি। কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন, কার কার নাম বেরিয়েছিল, আজ গভর্নমেন্ট চেঞ্জ হলেও মনে রাখবেন, আমি তো সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা তথ্যভান্ডার, সত্যভান্ডার।’

দেশে দেশে ‘র’-এর গুপ্তহত্যা

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে চর্চা চলছে, মমতা এই মন্তব্য কেন্দ্রীয় সরকারের বৈদেশিক নীতি বা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই জনসমক্ষে নিয়ে এসেছেন।

এর আগেও ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর বিরুদ্ধে বিদেশের মাটিতে গুপ্তহত্যার চেষ্টার অভিযোগ বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছে। এ অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০২৩ সালের জুনে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হারদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ড। কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো দেশটির পার্লামেন্টে অভিযোগ করেছিলেন, এ হত্যার পেছনে ভারত সরকারের এজেন্টদের হাত থাকার ‘বিশ্বাসযোগ্য তথ্য’ তাদের কাছে রয়েছে।

এ অভিযোগের পর ভারত ও কানাডার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। পাল্টাপাল্টি কূটনীতিক বহিষ্কার এবং ভিসাসেবা সাময়িক বন্ধের মতো ঘটনা ঘটেছিল। কানাডার ওই অভিযোগের রেশ ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। সেখানেও গুরপতবন্ত সিং পান্নুন নামে এক শিখ রাজনৈতিক কর্মী ও আইনজীবীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে ভারতীয় গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধে, যা নিয়ে মার্কিন প্রশাসন ভারতের কাছে কঠোর জবাবদিহিতা চেয়েছিল।

ভারত সরকার শুরু থেকেই এ অভিযোগগুলোকে ‘অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার পরে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছিল।

২০২৩ সাল থেকে ভারত ও কানাডার মধ্যে যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেটির বড় ধরনের পরিবর্তন বা ‘রিসেট’ লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের দিকে কানাডায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সম্পর্কের শীতলতা কমে আসে। কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন সরকার সম্পর্কের বরফ গলাতে শুরু করে এবং দুই দেশই এখন কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। বর্তমানে ভারত ও কানাডা তাদের সম্পর্কের একটি ‘পুনরুজ্জীবিত’ পর্যায়ে রয়েছে এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ অন কাউন্টার টেররিজম’ সক্রিয় করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মমতার মন্তব্যের সঙ্গে এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির একটি যোগসূত্র থাকতে পারে। ভারত যখন কানাডার মতো দেশের সঙ্গে গোয়েন্দাসংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে কৌশলগত সম্পর্কে ফিরছে, তখন মমতা বাংলাদেশের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং ভারতের ‘অপারেশনাল স্টাইল’-এর বিষয়টি সামনে এনে কেন্দ্রীয় সরকারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। মূলত এটিকে আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতিতে এক ধরনের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ তৈরির প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হাদি হত্যাকাণ্ডে আন্তঃদেশীয় যোগসূত্র

এদিকে হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি একটি সুপরিকল্পিত আন্তঃদেশীয় অপরাধমূলক যোগসূত্র শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে হত্যাকাণ্ডের আলামত, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল তথ্যের সমন্বয়ে অপরাধীদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তদন্তের বর্তমান পর্যায়ে ভারতের মাটিতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর সমন্বয় ঘটানো এবং তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার লক্ষ্যে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক ও আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

সিআইডি এ ঘটনার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের উন্মোচনে কাজ করে যাচ্ছে এবং তদন্তের এ প্রক্রিয়াকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ফয়সাল করিম মাসুদকে মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। পরে চলতি বছরের মার্চে মেঘালয় থেকে ফয়সাল করিম মাসুদ, আলমগীর হোসেন এবং ফিলিপ সাংমাকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...