আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

মৃত খাল-নালা পুনরুজ্জীবনে সরকারের মহাপরিকল্পনা

গাজী শাহনেওয়াজ

মৃত খাল-নালা পুনরুজ্জীবনে সরকারের মহাপরিকল্পনা

দেশের মৃত খাল ও নালাগুলোর পুনরুজ্জীবনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই কর্মসূচি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সাত হাজার কিলোমিটার নতুন খাল খনন, পুনঃখনন ও সংস্কার হবে। এর মধ্যে চলতি বছরে দেড় হাজার কিলোমিটার মৃতপ্রায় খাল, নালা ও জলাধারা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় ১৬ ও ১৭ মার্চ দেশের ১২টি জেলায় মোট ১৮টি খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে। পানিসম্পদ, কৃষির সেচ বিভাগ এবং দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটি সঠিকভাবে শেষ হলে দেশের মানুষ সরাসরি তিন ধরনের সুবিধা পাবে। এক্ষেত্রে দুই ধরনের সুবিধা প্রত্যক্ষভাবে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে। যার মধ্যে একটি হলোÑখাল খননের ফলে সেচ সুবিধার আওতা বাড়বে। এতে কৃষির উৎপাদন বাড়বে। অনুরূপভাবে, জলাধারা তৈরির ফলে মাছের সরবরাহ বাড়বে। পুরোনো রেওয়াজ অনুযায়ী মাছে-ভাতে বাঙালির চিরায়ত সেই ঐতিহ্যের ধারায় ফিরবে দেশ।

বিজ্ঞাপন

অন্যটি হলোÑসামান্য বৃষ্টিতে রাজধানীসহ সারাদেশে জলবদ্ধতা থেকে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, সেখান থেকে মানুষ মুক্তি পাবে। সরকারের চারটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের (পানি সম্পদ, কৃষি মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগ) সমন্বয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, দেশে আনুমানিক ৩০ হাজারের বেশি খাল রয়েছে। যার মধ্যে শুধু রাজধানীতে খালের সংখ্যা নিয়ে তিন সংস্থার তিন রকমের তথ্য পাওয়া গেছে। খাল সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসার হিসাবে নগরীতে খালের সংখ্যা ২৬। অন্যদিকে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের হিসাবে এ সংখ্যা ৫০। সর্বশেষ ঢাকা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) ঢাকায় মোট খালের সংখ্যা ৪৩টি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ওয়াসার হিসাবে ১২ এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের তথ্যনুযায়ী ২৪ খাল আংশিকভাবে এখনো প্রবহমান। বাকি খালগুলোর বেশিরভাগ অবৈধ দখলে বিলুপ্ত। কিছু আবার আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

এছাড়া সারা দেশের খালগুলোর চিত্র প্রায় একই। তবে বিএস বা আরএস খতিয়ানে অনেক খালের অস্তিত্ব এখন আর স্পষ্ট নয়। বহু স্থানে খাল ভরাট করে ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

বর্তমানে নদ-নদীর একটি হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার থাকলেও খাল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও একীভূত কোনো ডেটাবেজ নেই। ফলে খাল খনন, পুনঃখনন ও রক্ষণাবেক্ষণে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ও ভিন্নতা রয়েছে।

এদিকে, গত ৯ মার্চ সচিবালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ সংক্রান্ত ইস্যুতে পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সভাপতিত্ব করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। সভায় জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সারা দেশে জলাশয় ও খাল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৬৪টি জেলায় মোট সাত হাজার কিলোমিটার খাল খননের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

এতে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে সারা দেশে প্রায় এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে আগামী ১৬ মার্চ ১১টি জেলার ১৭টি খাল এবং ১৭ মার্চ লালমনিরহাট জেলায় একটি খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কাজের গুণগত মান ও গতি নিশ্চিত করতে ‘হাইব্রিড মডেল’ চালু করা হবে। এতে আধুনিক যন্ত্র যেমন : এসকাভেটর, দক্ষ শ্রমিক এবং কর্মসূচির আওতায় কার্ডধারী শ্রমিকদের সমন্বয়ে কাজ পরিচালনা করা হবে। একইসঙ্গে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) নির্দেশিকায় প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নন-ওয়েজ খাতে বর্তমান ১০ শতাংশের পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ব্যয়ের সুযোগ রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ইজিপিপির অর্থায়ন থেকে খাল খনন, পুনঃসংস্কার ও নতুন খাল খননের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।

সংশ্লিষ্টরা জানান, খাল খননের সময় উত্তোলিত মাটি স্থানীয় উন্নয়ন কাজে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। গ্রামীণ রাস্তা, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঈদগাহ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিচু জমি ভরাটে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজ খরচে মাটি নিতে পারবে। এছাড়া অতিরিক্ত মাটি উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। বিক্রয়লব্ধ অর্থ বিধি অনুযায়ী উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন তহবিল অথবা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, কারিগরি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর বিদ্যমান রেট শিডিউল অনুসরণ করে খননকাজের প্রাক্কলন প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা নিরূপণ করে ব্যয় নির্ধারণ করবেন।

এছাড়া পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়েও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী কোনোভাবেই ফসলি জমির ক্ষতি করা যাবে না এবং খালপাড়ে মাটি স্তূপ করে রাখা যাবে না এবং দ্রুত তা অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ কাজের অগ্রগতি তদারকিতে জেলা প্রশাসক ও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। এ বিষয়ে পাক্ষিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি মন্ত্রণালয়ে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে, এরই মধ্যে সরকারের নেওয়া এ উদ্যোগটি সফল করতে হলে দল নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায়, ইতিবাচক উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পটি স্বচ্ছতা নিরুপণ না হলে পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন