অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঐক্যের ডাকে রাজনৈতিক দলগুলো তাৎক্ষণিক ইতিবাচক সাড়া দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন-পরবর্তী রাজনীতিতে একটি সুদৃঢ় ঐক্যের পথ সুগম হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অপরিমেয় রক্তে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত ঐক্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক অঙ্গনের সর্বত্র অনৈক্য, এমনকি হানাহানির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষ করে দীর্ঘ আড়াই দশকের মিত্রশক্তি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে বর্তমানে সব থেকে বৈরী সম্পর্ক চলছে। রাখঢাক ছেড়ে দল দুটি একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিষোদ্গার করছে। সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্নে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়ে ইতোমধ্যে বিএনপি-জামায়াত বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে সম্পর্কের বৈরিতার ক্ষেত্রে মূল দলকে ছাপিয়ে গেছে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত দুটি ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। তারা ইতোমধ্যে বেশ কয়েক দফা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। তাদের মধ্যকার সম্পর্ক দিন দিন তিক্ত থেকে তিক্ততর হচ্ছে। এদিকে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত সফল গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী সমন্বয়কদের সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের পালটাপালটি বক্তব্য ফ্যাসিবাদবিরোধী দুই শক্তির মধ্যে বিরোধ চাঙা করছে। তাদের নতুন দল গঠন নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে একধরনের উষ্মা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াতের দ্বন্দ্বে অলিখিত দুটি ফ্রন্ট তৈরি হয়ে গেছে। সংস্কার ও নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তারা একই সুরে কথা বলছে। এক্ষেত্রে জামায়াত ছাড়া সাবেক ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বেশিরভাগ দলকে বিএনপি পাশে পেয়েছে। অপরদিকে জামায়াতের সুরে কথা বলছে কয়েকটি ইসলামি দল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির মধ্যে অনৈক্য দেশের জন্য মোটেই কল্যাণকর নয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশ এখনো বিপদমুক্ত নয়। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানে জড়িত শক্তিগুলোর মধ্যে এ অবস্থায় কোনো দূরত্ব বা ভুল বোঝাবুঝি কাম্য নয়। এতে করে দেশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় যারা বিরোধী, তারা উৎসাহিত ও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। অনৈক্য দেখা দিলে সেটা দেশের জন্য ভয়ানক বিপদ ডেকে আনতে পারে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। হাসিনার পতন আন্দোলনে ছাত্র-জনতা সামনে থাকলেও পেছন থেকে আওয়ামীবিরোধী সব দলেরই সমর্থন ছিল। তাদের অনেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণও করেছিল। তীব্র আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনে রাজনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল। আওয়ামী লীগ ও তার জোটভুক্ত দলগুলোর বাইরে সব দল ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে চলতে শুরু করেছিল। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টিকেও জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলো স্বাগত জানিয়েছিল।
তবে রাজনৈতিক দলসহ ছাত্র-জনতার মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য তৈরির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, কিছুদিন যেতে না যেতেই তা ফিকে হতে শুরু করে। এ সময় সম্পর্ক উন্নয়নের পরিবর্তে শীতল হতে শুরু করে। সবচেয়ে বড় করে দৃশ্যমান হয়েছে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে পাশাপাশি চলতে থাকা বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব। প্রায় প্রতিনিয়তই দল দুটির নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সুরে কথা বলছেন বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে গত আড়াই দশকের মধ্যে সব থেকে বৈরী সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মাথায় বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। জনপ্রশাসন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নিয়োগ-পদায়নে প্রাধান্য নিয়ে বিএনপি-জামায়াত একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করে। সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্নে দল দুটির বিপরীত অবস্থানের কারণে তাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়। বিএনপির দাবি ন্যূনতম সংস্কার করে দ্রুত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। এক্ষেত্রে দলটির দাবি, ডিসেম্বরের মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজন।
বিএনপি এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তীব্র বিরোধিতা করছে। বিএনপি তার সমমনা ২০ দলীয় জোট, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও কিছু বাম দলও স্থানীয় সরকারের আগে সংসদ নির্বাচন করার কথা বলেছে। অপরদিকে জামায়াতের দাবি, আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান। এক্ষেত্রে সরকারকে প্রয়োজনীয় যৌক্তিক সময় দিতে দলটির কোনো আপত্তি নেই বলে জানিয়েছে। জামায়াতের পাশাপাশি কয়েকটি ইসলামি দল, নুরুল হক নুরুর নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ আরো কয়েকটি দল ও জোট নির্বাচনের আগেই দৃশ্যমান সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে।
সব মিলিয়ে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে ভোটের হিসাব-নিকাশ যত এগিয়ে আসছে, বিরোধ ততই চাঙা হচ্ছে। দীর্ঘদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভোটের অধিকারসহ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে একসঙ্গে রাজপথে থাকা বিএনপি-জামায়াত একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দুই দলের নেতারা কটাক্ষ করছেন এবং তাদের অবস্থান একে অপরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিএনপির তরফ থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেক্টরে জামায়াতিকরণের অভিযোগ তোলা হয়েছে। দলটি প্রকাশ্যে জামায়াতকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী দল’ বলে আখ্যায়িত করছে। জামায়াতের পক্ষ থেকেও বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে বিএনপির সমালোচনা করা হচ্ছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন নিয়েও একধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে দল গঠিত হওয়ার পর সংকট আরো ঘনীভূত হতে পারে। তখন জুলাই ঘোষণা, বড় ধরনের সংস্কারসহ ছাত্র-জনতার দাবি রাজনৈতিক দাবি আকারে সামনে চলে আসতে পারে।
মূলধারার রাজনীতির পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিতে বড় ধরনের বিরোধ দেখা দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে একসময়ের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হচ্ছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে আসার পর থেকে বিরোধও প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
কোথাও কোথাও অনেকটা মুখোমুখি অবস্থানে দেখা গেছে এ দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের। ঘটেছে সংঘর্ষের ঘটনাও। চলছে দোষারোপের রাজনীতি। ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে আসার বিষয়ে প্রথমে বাম ছাত্রসংগঠনগুলো বিরোধিতা করলেও পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয় বিএনপি সমর্থিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল। তারা ছাত্রশিবিরকে ‘গুপ্ত সংগঠন’ বলে আখ্যায়িত করছে। ক্যাম্পাসে ‘মব’ সৃষ্টি করে ছাত্রদলের ওপর দায় চাপাচ্ছে বলে শিবিরের দিকে আঙুল তুলছে। শিবির ছাত্রলীগের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ছিল বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে।
অপরদিকে পালটা জবাবে ছাত্রদলকে সবচেয়ে বড় ‘গুপ্ত সংগঠন’ আখ্যায়িত করে শিবির দাবি করছে, এতদিন তাদের ব্যানার ধরার কেউ ছিল না। হঠাৎ তারা সংগঠিত হতে শুরু করেছে। পরস্পরের বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের জেরে সম্প্রতি কুয়েটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর জেরে আরো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘাত দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের অনৈক্যকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ। আমার দেশকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, রাজনীতিতে অতিসম্প্রতি যে অনৈক্য আমরা দেখছি, সেটাকে আমি বিপজ্জনক মনে করছি। কারণ, ফ্যাসিবাদের যে ছোবল আমাদের আঘাত করেছিল, সেটা থেকে এখনো আমরা পুরোপুরি মুক্ত হতে পারিনি। ফ্যাসিবাদের শেকড় এখনো রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে গেছে। তাদের লোকজন তো এখনো আমাদের আশপাশে আছে। পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে। তিনি সেখানে বসে কলকাঠি নাড়ছেন।
বাংলাদেশ এখনো ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদমুক্ত নয় উল্লেখ করে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, কৌশলগত কারণে আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে; কিন্তু উচিত ছিল মতপার্থক্য সত্ত্বেও ঐক্যবদ্ধ থাকা। দেশের বিপদ না কাটতেই যে ধরনের বিরোধ ও অনৈক্য আমরা দেখছি, সেটা কোনো ভালো বার্তা দেয় না। এ ধরনের অনৈক্য দেশের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে। এতে সুযোগসন্ধানীরা সুবিধা নিতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, কত দ্রুত কে ক্ষমতায় যাবেÑ সেটার জন্য একধরনের প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছে। আগামীতে কোন দল ক্ষমতায় যাবে, এটা দিবালোকের মতো সত্য। তবে তারা সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ না করে কেন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, এটা সন্দেহ তৈরি করছে।
নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যেখানে ক্ষমতার প্রশ্ন জড়িত আছে, সেখানে ঐক্য আশা করে লাভ নেই। অনৈক্য হবেই। রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে কেউ কাউকে ছাড় দেবে বলে মনে হয় না। সংস্কার, নির্বাচনসহ সব ইস্যুতেই আমরা অনৈক্য দেখব- এটাই স্বাভাবিক মনে করি। কারণ একটি পক্ষ হয়তো কোনো একটি সংস্কার প্রস্তাবকে ধ্বংসাত্মক আখ্যায়িত করবে; অপর পক্ষ বলবে ষড়যন্ত্রমূলক।
তিনি বলেন, সবই একসঙ্গে হলে সবকিছু মসৃণ হতো। কিন্তু একসঙ্গে হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। পরস্পর তো কথা বলা অনেকটা বন্ধ করেই দিয়েছে। কাজেই এভাবে চলতে থাকলে মতপার্থক্য আরো বাড়বে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার আমার দেশকে বলেন, আপনারা বিএনপির সঙ্গে আমাদের বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে যেটা প্রচার করছেন- সেটা সঠিক নয়। আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক নেই। সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আর প্রতিটি দলের কিছু আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ভিন্ন ভাবনা থাকতেই পারে, ভিন্ন অবস্থান থাকতে পারে। এটাকে মতপার্থক্য বলতে পারেন; কিন্তু বিরোধপূর্ণ নয়।
উল্লেখ্য, রাজনীতিতে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সখ্য বহুদিনের। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের সময় দলটি সমর্থন দিয়েছিল। মাঝে অবশ্য বিএনপিকে ছেড়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক গড়ে তোলে জামায়াত। পরে ১৯৯৯ সালে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি (নাজিউর) ও ইসলামী ঐক্যজোট মিলে চারদলীয় জোট গঠন করা হয়।
এই জোটটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন টিকে থাকে। জোটটি ২০০১ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ওই সময় বিএনপির সঙ্গে জামায়াতও সরকারের অংশীদার হয়। এই জোট ২০০৮ এবং ২০১৮ সালে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে।
অবশ্য এর আগে ২০১২ সালে চারদলীয় জোটের সম্প্রসারণ হয়ে প্রথমে ১৮ দলীয় জোট এবং পরে ২০ দলীয় জোট নাম ধারণ করে। ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যৌথভাবে ২০১৮ সালে নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে আওয়ামী লীগের ‘রাতের ভোটের’ কৌশলে জোটটির ভরাডুবি হয়। নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতের ২২ প্রার্থী ওই নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীকে ভোটে অংশ নিয়েছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জোটসঙ্গী হিসেবে একটি সম্পর্ক রেখে চললেও ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এ সময় সম্পর্ক ছিন্ন করতে বিএনপির মধ্যকার জামায়াতবিরোধী অংশের বেশ চাপ ছিল। তবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের নানামুখী চাপে থাকার কারণে দলীয় চেয়ারপারসনসহ দলটির জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল অংশ জোট ভাঙার বিপক্ষে ছিল।
এরই মধ্যে ২০ দলীয় জোট গঠনের সময়ও জোটভুক্ত বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো থেকে জামায়াত ইস্যুতে একধরনের আপত্তি তৈরি হয়েছিল। ওই সময় থেকে বিএনপি অবশ্য জামায়াতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে।
বিএনপি কখনো জামায়াতের সঙ্গে আলাদা করে সম্পর্ক রেখেছে; আবার কখনো ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে যৌথভাবে কর্মসূচি পালন করেছে। জামায়াতের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক তৈরি হলেও দলটির আমির মতিউর রহমান নিজামীসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি করার সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
এদিকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হলেও ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বহুল আলোচিত ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিলুপ্ত করা হয়। ওই সময় ৯ ডিসেম্বর রাতে জোটের শরিকদের ডেকে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলে দেওয়া হয়Ñ এখন থেকে কেউ যেন ২০ দলীয় জোটের নাম ব্যবহার না করে।
বলা হয়েছিল, সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের গতি বাড়াতে নতুন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবশ্য এই যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে ‘বিএনপি-জামায়াত’ নামে যে নেতিবাচক প্রচার রয়েছে, সেটি কাটানোর একটি কৌশল ছিল বলে বিএনপি সূত্র জানিয়েছে। এরপর থেকে বিএনপি ও জামায়াতকে প্রকাশ্যে একইসঙ্গে দেখা যায়নি। তবে তারা যুগপৎ কর্মসূচি পালন করেছে।
এর অংশ হিসেবে বলা যেতে পারে- ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর বিএনপির নয়াপল্টনে মহাসমাবেশের দিকে জামায়াত নটর ডেম কলেজ সংলগ্ন সড়কে সমাবেশ করেছিল। এরপর দল দুটির আবার একই মঞ্চে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সেটা বাস্তবে দেখা যায়নি। উল্লেখ্য, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিনাভোটের নির্বাচন বর্জন করেছিল। বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের অন্য শরিক ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যুগপৎ অবস্থানে থেকে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ডামি নির্বাচন বর্জন করেছিল।