৩৯ বছর ধরে বন্ধ নির্বাচন
দীর্ঘ ৩৯ বছর নির্বাচন না হওয়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) সিনেটের কার্যক্রম চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিদের দিয়ে। সর্বশেষ ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে সিনেট সদস্য হন ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট। এসব প্রতিনিধির মেয়াদ শেষ হয় ১৯৮৯ সালে। কিন্তু এরপর আর কোনো নির্বাচন না হওয়ায় সিনেটের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। ইতোমধ্যে ওই ২৫ সদস্যের মধ্যে মারা গেছেন ১০ জন । দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন মহল নির্বাচনের দাবি জানালেও প্রশাসনের ব্যর্থতায় সেটা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী তিন বছর পর নির্বাচন না হওয়া আইনের লঙ্ঘন।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৭৩ অনুযায়ী সিনেট গঠিত হয় উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, সরকার মনোনীত পাঁচ সরকারি কর্মকর্তা, স্পিকার মনোনীত পাঁচ সংসদ সদস্য, আচার্য মনোনীত পাঁচ শিক্ষাবিদ, সিন্ডিকেট মনোনীত গবেষণা সংস্থাগুলোর পাঁচ প্রতিনিধি, পাঁচজন কলেজ অধ্যক্ষ, ১০ জন কলেজশিক্ষক, উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কুমিল্লার চেয়ারম্যান, নির্বাচিত ২৫ রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ৩৩ শিক্ষক এবং ছাত্র সংসদ থেকে নির্বাচিত পাঁচ ছাত্রপ্রতিনিধি নিয়ে। তবে সব পদে নিয়মিত পরিবর্তন এলেও গত ৩৯ বছরে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিদের পদে কোনো পরিবর্তন আসেনি । এছাড়া দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় ছাত্রদের প্রতিনিধিও সিনেটে অনুপস্থিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ সিনেটে দীর্ঘদিন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন না হওয়া মূলত রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থগত কারণ বলে মনে করেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল মালেক চৌধুরী। তিনি আমার দেশকে বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আর আই চৌধুরী, আবদুল মান্নান সাহেব, নূরউদ্দিন সাহেব, আবু ইউসুফ সাহেব এবং বদিউল আলম সাহেবকে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট নির্বাচন দেওয়ার কথা বলেছি; কিন্তু তারা তা শোনেননি।
তিনি বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪২ বছর ছিলাম। এ সময়ে আমি দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হাউস টিউটর সিট দিয়ে, সহকারী প্রক্টরের পদ দিয়ে বা প্রভোস্ট পদ দিয়ে কেনা যায়। একটি টেলিফোনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চুপ হয়ে যান। শিক্ষকরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন না বলে মনে করেন ১৯৮৬ সালে নির্বাচিত প্রথম রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি অধ্যাপক আবদুল মালেক।
রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি ও সিন্ডিকেট সদস্য এসএম ফজলুল হক আমার দেশকে বলেন, গত ৩৯ বছরে যতগুলো সিনেট অধিবেশন বসেছে, সবগুলোতেই নির্বাচন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কেন নির্বাচন দেয়নি—এটা প্রশাসন ভালো বলতে পারবে।
রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি এসএম খোরশেদ আলম বলেন, আমি গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে সিনেট সভায় অংশগ্রহণ করি না।
লোক-প্রশাসন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তবুদ্ধিচর্চা অবারিত ও গণতান্ত্রিকচর্চা অব্যাহত রাখতে সিনেটে রেজিস্টার্ড শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি রাখার নিয়ম বিশ্ববিদ্যালয় আইনে যুক্ত করা হয়েছে। এজন্য নিয়মিত নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, নির্বাচন শাখায় ইতোমধ্যেই রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের তালিকা বের করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নতুন এ তালিকায় আরো অনেক নতুন গ্র্যাজুয়েট অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ কার্যক্রম শেষ হলেই নির্বাচন দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিগত প্রশাসনের সময় যারা দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাদের অনিচ্ছার কারণেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।