খুলনা রেলস্টেশনের ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় হঠাৎ ভেসে ওঠে ‘ছাত্রলীগ আবার ভয়ংকর রূপে ফিরবে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। শেখ হাসিনা আবারও আসবে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের ১৩ মাস পর ভয়ংকরভাবে ফিরতে না পারলেও প্রতিনিয়ত অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ। মহানগরীর আট থানায়ই মিছিল করেছে তারা। মিছিল ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে ১২টি মামলা করেছে। কর্মীদের সংগঠিত ও চাঙা রাখতে অর্থ আসছে বিদেশ থেকে। যদিও পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে।
জানা গেছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে দোর্দণ্ড দাপট দেখানো নেতারা গা-ঢাকা দিয়েছেন। কিছু নেতা বিদেশে পাড়ি দিলেও অধিকাংশই রয়েছেন দেশে। তাদের অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। মাঝেমধ্যেই ভিডিও বার্তা বা স্ট্যাটাসে উজ্জীবিত করছেন কর্মীদের।
রাজপথে মিছিল, মশাল ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে টাকা দেওয়া হচ্ছে কর্মীদের। ভারতের কলকাতা এবং সিঙ্গাপুর থেকে টাকা আসার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।
টাকা আসছে ভারত-সিঙ্গাপুর থেকে
গত ২১ আগস্ট বরিশাল থেকে ঢাকাগামী সাকুরা পরিবহনের একটি বাস থেকে আটক করা হয় খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বায়েজিদ জান্নাত সিনহাকে (২৯)। তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা মামলার আসামি।
৫ আগস্টের পর পালিয়ে থেকেও খুলনায় মিছিল করার জন্য নেতাকর্মীদের বিকাশে টাকা পাঠানো হয়েছে। ওই টাকা এসেছে ভারতের কলকাতায় অবস্থানরত শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সোহেলের কাছ থেকে। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বায়েজিদের মোবাইল ফোন চেক করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। তিনি নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডের ১১২ নেতাকর্মীকে মাথাপিছু দুই হাজার টাকা করে দিয়েছেন। সবাইকে পৃথকভাবে টাকা দিলেও মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম আসাদুজ্জামান রাসেল ১৬ জনের এবং অপর ছাত্রলীগ নেতা আহনাফ হোসেন অর্পণ নিয়েছেন ১১ জনের টাকা।
আন্দোলন পরিকল্পনায় এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ডোনার সিঙ্গাপুর প্রবাসী মো. মাহফুজ খন্দকার। রূপসা উপজেলার শ্রীফলতলা ইউনিয়নের নন্দনপুর গ্রামে তার বাড়ি। পদ-পদবিতে না থেকেও তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে সরব। নিয়মিত পোস্ট ও অডিও বার্তায় বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি। পুলিশ মাহফুজের ভাই শরিফুল ইসলাম খন্দকারকে গ্রেপ্তার করেছে।
মাহফুজ সবশেষ গত ১৩ সেপ্টেম্বর অডিও বার্তায় খুলনার নেতাকর্মীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এবং যে কোনো প্রয়োজনে যুবলীগ নেতা জাফরিন হাসান, ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম সাঈফ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রাজু এবং শ্রমিক লীগ নেতা ইখলাসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেন।
গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র জানিয়েছে, ১৪টি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সংযুক্ত থেকে তারা পারস্পরিক যোগাযোগ রাখছেন। খুলনা ছাড়লেও অনেকেই আশপাশের জেলায় অবস্থান করছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী রয়েছেন গোপালগঞ্জে। ১৫ বছরে অবৈধ পন্থায় উপার্জন করা বিপুল অর্থ রয়েছে তাদের হাতে।
আলোচিত শীর্ষ নেতারা কে কোথায়
সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম জুলাই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত লগ্নে প্রকাশ্যে শটগান দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান। শেখ হাসিনার পতনের পর আশ্রয় নেন সেনা ছাউনিতে। এখন ঢাকায় আছেন। কয়েক দফা খুলনা বারের সভাপতির পদ দখলকারী এই নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে আইনজীবী সমিতির ২৫ কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগ। মামলা হয়েছে এক ডজন, যার মধ্যে আইনজীবী সমিতির সাতটি।
জেলা আ.লীগের যুগ্ম সম্পাদক কামরুজ্জামান জামাল ফেসবুকে সক্রিয়। কর্মীদের উৎসাহ জোগাতে তিনি বিভিন্ন পোস্ট দেন। কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন ১৫ বছরে। কর্মীদের বিপদে বা সমস্যায় তার কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা আসছে বলে জানা গেছে।
সক্রিয় রয়েছেন মহানগর যুবলীগের সভাপতি শফিকুর রহমান পলাশ। পলাতক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের বদান্যতায় আয় করেছেন কোটি কোটি টাকা। সেই সঙ্গে আওয়ামী শাসনামলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ রাখতেন তিনি।
ছাত্রলীগ নেতা থেকে পুলিশ প্রশাসন ও জনপ্রশাসনের রিক্রুট হওয়া সবার নামের তালিকা ছিল নখদর্পণে। আড়ালে থেকেও এখনো সেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা।
ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির কারণে কুখ্যাত ছিলেন ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলী আকবর টিপু, ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জেডএ মাহমুদ ডন, ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এসএম খুরশিদ আহম্মেদ টোনা ও তার ভাই মোরশেদ আহম্মেদ মনি, ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কাজী তালাত হোসেন কাউট ও তার ভাই ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি ইয়াসির আরাফাত হোয়াইট, মহানগর যুবলীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য এসএম হাফিজুর রহমান হাফিজ, ২৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি শওকত হোসেন, তার ভাই রিপন ও যুবলীগ নেতা মাসুম হোসেন। এরা আত্মগোপনে থাকলেও অনুসারীরা রয়েছেন প্রকাশ্যে।
আটক-জামিনের চোর পুলিশ খেলা
খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট এমএম মুজিবর রহমান পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর তার মোবাইল কললিস্ট ও মেসেজ চেক করে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পায় পুলিশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে সোনাডাঙ্গা থানায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। তবে এ মামলা হওয়ার আগেই মুজিবর রহমান জামিনে বেরিয়ে লাপাত্তা হন।
শুধু এ ঘটনা নয়, মিছিল থেকে বা বিভিন্ন মামলার আসামি হিসেবে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের যারা বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের সবাই এখন জামিনে রয়েছেন।
খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে আমার দেশকে বলেন, ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে যারা জঘন্যতম বিভিন্ন অপরাধ করেছিলেন, তারাও জামিন নিয়ে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কাজটি যাতে সহজ হয়, এজন্য তারা বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের দ্বারস্থ হচ্ছেন। কোর্ট প্রাঙ্গণে পা রাখলে এ নিয়ে নানা কথা, নানা গুঞ্জন শোনা যায়। বিগত দিনে ক্ষতিগ্রস্ত রাজনৈতিক কর্মীরা জামিনে সহায়তাকারী আইনজীবীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন। পাড়া-মহল্লায় আওয়ামী দোসরদের নিরাপদ রাখার দায়িত্বও কেউ কেউ পালন করছেন। এজন্য লেনদেন হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।
এভাবে চলতে থাকলে নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটি যে কোনো সময় সংঘবদ্ধ হয়ে আঘাত হানতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন এই সিনিয়র আইনজীবী।
তবে খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরুল হাসান রুবা বলেন, আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত আছে- সাইফুল গ্রেপ্তার হলে বারের কোনো সদস্য তার পক্ষে দাঁড়াবেন না।
যা বললেন কেএমপি কমিশনার
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো এখন অনেক দুর্বল। প্রথম সারির নেতাদের কেউই এলাকায় নেই। অনেকে দেশের বাইরে এবং কেউ কেউ অন্য জেলায় আত্মগোপনে আছেন। কিছু মিছিল হয়েছে কিন্তু মিছিলকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করেছি। টাকার বিনিময়ে মিছিল করতে এসেছেন, এমনও পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ১৫-১৬ বছর তারা একভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। মিছিলকারীরা ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করছে। এর মাধ্যমে অনেকে শনাক্ত হচ্ছে।
স্থানীয় জনগণও সহযোগিতা করছে। মিছিলের ব্যানার কোথায় তৈরি হয়, তার সন্ধান পাওয়া গেছে। কারা টাকা বিনিয়োগ করছেন, চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে খুলনা পুলিশ জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে।