হোম > আমার দেশ স্পেশাল

হাসপাতালের চেয়ে ৮ গুণ বেশি ডেঙ্গু রোগী বাসায়

আজাদুল আদনান

এবারও প্রকট হচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। গত ছয় মাসে মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিগত বছরগুলোর মতোই ভয়াবহ বার্তা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ১০ সহস্রাধিক আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪২ জনের।

তবে এটি প্রকৃত অবস্থা নয়। ডেঙ্গুর আসল চিত্র কখনোই জাতীয়ভাবে তুলে ধরা হয়নি। শুধু তা-ই নয়, সংগ্রহও করা হচ্ছে না মাঠের তথ্য। অথচ হাসপাতালে ভর্তি রোগীর চেয়ে অন্তত ৮ গুণ বেশি মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন বাসা-বাড়িতে।

হাসপাতালের বাইরে এত বিপুলসংখ্যক রোগী থাকলেও তাদের বিষয়ে আগ্রহ নেই সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের। জোর দেওয়া হচ্ছে না মশক নিধন কার্যক্রমেও। পরিণতি যা হওয়ার তাই হচ্ছে, ভয়াবহ আকার নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। সরেজমিনে বিভিন্ন হাসপাতাল ও বাসাবাড়িতে খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে এসব তথ্য।

চার সদস্যের পরিবার নিয়ে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তালতলা মার্কেটের পাশে বসবাস করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক জসিমউদ্দিন। সপ্তাহখানেক আগে জ্বর, শরীরে ব্যথাসহ নানা জটিলতা দেখা যায় জসিম ও তার স্ত্রী রোকসানা আক্তারের। পার্শ্ববর্তী ফার্মেসি থেকে ‍ওষুধ কিনে খেয়ে তারা কিছুটা সুস্থ হন। দুদিন পর দুই সন্তান জ্বরে আক্রান্ত হয়। ওষুধ খাওয়ানোর পরও তাদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। পরে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাদের। এর মধ্যে বড় মেয়ে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইশার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। একই সঙ্গে ওই দম্পতির ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হলে তাদের দেহেও ভাইরাসটির উপস্থিতি পাওয়া যায়। তবে জটিলতা গুরুতর না হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হননি তারা। ছয় দিন ধরে ভর্তি আছে মাইশা।

রোববার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা যায়, ওয়ার্ডে জায়গা না হওয়ায় মেঝেতে রেখেই স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে মাইশাকে। এ সময় শিশুটির মা রোকসানা আমার দেশকে জানান, ‘আমরা পূর্ণবয়স্ক মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ডেঙ্গুর ব্যথা সহ্য করতে পারি না, সেখানে শিশুটির অবস্থা কতটা ভয়াবহ। প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় খুবই খারাপ অবস্থা হয়েছিল। এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে।’

ডেঙ্গুতে নাজেহাল ছোট্ট এ পরিবারের শোচনীয় অবস্থা দেখে স্পষ্ট হয় দেশে ডেঙ্গু এবারও কতটা ভয়াবহতা ছড়াচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে এখনো শয্যার সংকট না হলেও সরকারি ব্যবস্থাপনা উন্নত না হওয়ায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে ইতোমধ্যে স্যালাইন ও অন্যান্য চিকিৎসা উপকরণের সংকট দেখা দিয়েছে। সংকটাবস্থা দেখেও অনেককে পাঠানো হচ্ছে ঢাকায়।

এরপরও দেশের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিয়ত জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, শরীর ব্যথাসহ ডেঙ্গুর নানা উপসর্গ নিয়ে ভিড় করছেন হাজার হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে কী পরিমাণ ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে তার বাস্তবচিত্র দেখা গেছে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সরকারি চারটি হাসপাতাল ঘুরে।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বরগুনা জেলা সদর হাসপাতাল ঘুরে যে পরিমাণ ভর্তি রোগী পাওয়া গেছে তার চেয়ে গড়ে ৮ গুণ বেশি ডেঙ্গু আক্রান্তকে দেখা গেছে বাসায় অবস্থান করতে।

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, বহির্বিভাগে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে গত ২৭ জুন পর্যন্ত প্রায় তিন মাসে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ২৯২ জনের। এর মধ্যে ৭০ জনকে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বাসায় রয়েছে অবশিষ্ট রোগীরা।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একই সময়ে ৭ হাজার ৬৪৯টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। গড়ে যা প্রায় ১৪ শতাংশ। তবে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৫১ জন। সে অনুযায়ী বাসায় রয়েছেন প্রায় ২১ গুণ রোগী। তাদের কেউ বিভিন্ন উপায়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন, কেউবা চিকিৎসার বাইরে থাকছেন।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. শামীম আরা কেয়া আমার দেশকে বলেন, ‘বর্তমানে রোগী বেশি আসছে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে। যেহেতু সাধারণ জ্বর থেকে শুরু করে চিকনগুনিয়া, করোনার প্রকোপও এখন রয়েছে। তাই উপসর্গ রয়েছে এমন রোগীর ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মধ্যে যাদের জটিলতা গুরুতর, তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে।’

ঢাকা মেডিকেলে গত ২৪ ঘণ্টায় ১০ জন ডেঙ্গু আক্রান্তকে ভর্তি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছর সেখানে ৪১২ জন এ রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১০ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬৯ জন। ভর্তি হওয়া এসব রোগীর অধিকাংশই ঢাকার বাইরে থেকে আসা। প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি ডেঙ্গু পরীক্ষা হচ্ছে হাসপাতালটিতে। এর মধ্যে পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশের। যার অধিকাংশকিই বাসায় থাকতে পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। তবে গত তিন মাসে শনাক্ত হওয়া রোগীর মধ্যে ভর্তিযোগ্য কতজন ছিল সে ব্যাপারে সঠিক তথ্য দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে বরগুনায়। জেলার সদর উপজেলায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত সাড়ে ৮ গুণ বেশি। ৫৬ শতাংশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে বাসা-বাড়িতে ধরে রাখা বৃষ্টির পানিতে। সেখানেও আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকই এখনো প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।

বরগুনা জেলা সদর হাসপাতালে গত তিন মাসে ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ৫৪২ জনের। এসব রোগীর অর্ধেকের বেশি হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও বাকিরা বাসায় থাকছেন। যারা নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন কিনা তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. তাজকিয়া সিদ্দিকী আমার দেশকে বলেন, ‘বরগুনা ডেঙ্গুতে এবার সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে। উপসর্গ নিয়ে যারা আসছেন তাদের পরীক্ষায় নেগেটিভ এলেও পজিটিভ হিসেবে ধরে নিচ্ছি আমরা। তারপরও আক্রান্তদের বড় একটি অংশ বাসায় থাকছেন। যা ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হবে। শুধু হাসপাতালে রোগী ভর্তির চিত্র দেখে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। এজন্য বাসায় থাকা রোগী ধরে নিয়ে সে অনুযায়ী ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাতে হবে।’

সরকারি হাসপাতালের এমন তথ্য অনুযায়ী এই মুহূর্তে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৮০ হাজারের বেশি। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে শনাক্তের হার অনেক বেশি ছিল বিগত বছরগুলোতে। এবারও একই চিত্র বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। ইতোমধ্যেই লাখের ঘরে পৌঁছেছে আক্রান্তের সংখ্যা। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ভর্তি রোগীর তথ্যকে আক্রান্ত বলে দেখানো হচ্ছে। যা বিভ্রান্তিকর বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১০ হাজার ২৯৬ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হন ২ হাজার ৪২৯ জন। মোট রোগীর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪২ জনের।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ আমার দেশকে বলেন, ‘এটি এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরশেন সিস্টেম) শাখার করার কথা। হাসপাতালগুলোর ল্যাবের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকে, সেখান থেকেই নির্দেশনা আসার কথা।’

অন্যদিকে এমআইএস আঙুল তুলছে সিডিসির দিকে। এমআইএসের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ডা. কুলসুম আরা বলেন, ‘কোনো হাসপাতাল ভর্তির পাশাপাশি পরীক্ষা ও শনাক্তের তথ্য দেবে কিনা সেটি হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা ও সিডিসি দেখার কথা। তবে আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত এটি হওয়া উচিত। আমরা উদ্যোগ নেব।’

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার আমার দেশকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আমরা যে তথ্য পাই সেটি ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র নয়। এটি পাহাড়ের এক পাশ দেখার মতো। আমাদের ধারণা ভর্তি রোগীর চেয়ে অন্তত ১০ গুণ রোগী বাসায় রয়েছে। এতে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে। একদিকে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা যেমন ঠিকমত হবে না, অন্যদিকে রোগীর সচেতনতার অভাবে সংক্রমণ বাড়বে।’

২৬ মার্চ ঘিরে প্রত্যাবর্তনের ছক নিষিদ্ধ আ.লীগের

চট্টগ্রামে দেড় বছরে ১৮৬ পোশাক কারখানা বন্ধ

প্রথম অধিবেশনই উত্তপ্ত হচ্ছে

১৮ মাস পার হলেও অগ্রগতি নেই জুলাই বিপ্লব সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর

ঋণখেলাপি সংস্কৃতি উত্থানে চার কারণ

শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল দ্রুত চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ফারাক্কা দিল্লির কূটনৈতিক অস্ত্র নাকি ঢাকার সার্বভৌমত্বের লড়াই

গ্রাহক টানতে পারছে না স্টারলিংক

পারস্পরিক সহযোগিতায় দেশ পরিচালনা করুন

সিটি করপোরেশন আইনে সংশোধনী আনবে ইসি