সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ প্রবর্তনের কথা বলেছে। সেখানে এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে সাত বিকল্পের কথা বলেছে কমিশন। তাদের সুপারিশে রাষ্ট্রপতির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে।
সাধারণ নাগরিক ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের থেকেও প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনের মতো বিচার বিভাগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে বাছাইয়ে সংস্কার কমিশন তার প্রস্তাবিত ‘জাতীয় সংবিধানিক কাউন্সিলকে (এনসিসি)’ বাড়তি ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলেছে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সারসংক্ষেপ পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রফেসর আলী রীয়াজের নেতৃত্বে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন গত ১৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। পরে কমিশন ওয়েবসাইটে সারসংক্ষেপ আপলোড করেছে। আগামী ৩১ জানুয়ারি কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশের কথা রয়েছে।
সংস্কার কমিশন তার সুপারিশে আইনসভার মেয়াদ শেষ হলে বা ভেঙে গেলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার নিয়োগের কথা বলেছে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, এই সরকারের প্রধান ‘প্রধান উপদেষ্টা’ বলে অভিহিত হবেন। আইনসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে এবং ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে হবে। প্রধান উপদেষ্টাসহ সর্বোচ্চ ১৫ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এ সরকারের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ৯০ দিন। মেয়াদ শেষের আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শপথ নিলে শপথ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে এর মেয়াদের অবসান ঘটবে।
নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন ও নির্বাচন পরিচালনার জন্য ১৯৯৬ সালে বিএনপি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। পরে ২০১১ সালের ১০ মে উচ্চ আদালত তা বাতিল করে দেয়। অবশ্য আদালত তার রায়ে ‘পরবর্তী দুটি নির্বাচন’ এ ব্যবস্থায় হতে পারে বলে পর্যবেক্ষণ দেয়। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থেকে বিচারপতিদের বাইরে রাখার কথা বলেছে।
এদিকে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই পতিত শেখ হাসিনার সরকার ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দেয়। অবশ্য সম্প্রতি (১৭ ডিসেম্বর, ২০২৪) আদালত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান বিলুপ্ত করে পঞ্চদশ সংশোধনীর অংশটি বাতিল করে এ ব্যবস্থা আবারো পুনরুজ্জীবিত করে রায় দিয়েছে।
১৯৯৬ সালের সংবিধান সংশোধনে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ বিধান হলেও আলী রীয়াজের সংস্কার কমিশন সুপারিশে করেছে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ গঠনের। আগের বিধান অনুযায়ী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের এখতিয়ার এককভাবে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত ছিল। তবে সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বড় অংশের ক্ষমতা দিয়েছে জাতীয় সংবিধানিক কাউন্সিলকে।
ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচটি বিকল্পের কথা বলা হয়। এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; অসম্মত হলে বা না পাওয়া গেলে তার অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; অসম্মত হলে বা না পাওয়া গেলে আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি; অসম্মত হলে তার অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি এবং অসম্মত হলে বা না পাওয়া গেলে রাষ্ট্রপতি যতদূর সম্ভব প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে যোগ্যতাসম্পন্ন নাগরিকদের মধ্য থেকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দেবে।
এদিকে সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতিতে সাত ধরনের বিকল্পের সুপারিশ করেছে। তাদের (শর্তসাপেক্ষে) সুপারিশ হচ্ছে : এনসিসির সদস্য ব্যতীত দেশের নাগরিকদের মধ্য থেকে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি; ১. অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি; ২. প্রধান উপদেষ্টার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে রাষ্ট্রপতি; ৩. সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; ৪. অসম্মত হলে তার অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; ৫. (অসম্মত হলে পর্যায়ক্রমে অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি); আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি; ৬. এবং অসম্মত হলে তার অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি; ৭. এবং অসম্মত হলে পর্যায়ক্রমে অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা হবেন।
সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম বিকল্পের ক্ষেত্রে এনসিসির ৯ সদস্যের মধ্যে কমপক্ষে ৭ জন, দ্বিতীয় বিকল্পের ক্ষেত্রে এনসিসির ৯ সদস্যের মধ্যে কমপক্ষে ৬ জন এবং তৃতীয় বিকল্পের ক্ষেত্রে (রাষ্ট্রপতি) এনসিসির ৯ সদস্যকে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পরের চার ধরনের বিকল্পের ক্ষেত্রে এনসিসির সম্মতির কোনো বিষয় থাকছে না। এ ক্ষেত্রে অনেকটা ১৯৯৬ সালের মতো পর্যায়ক্রমিকভাবে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য লেখক ফিরোজ আহমেদ আমার দেশকে বলেন, অতীতে দেখেছি কম বিকল্প থাকার সুযোগে নিজেদের পছন্দমতো ব্যক্তিকে অন্তর্বর্তী সরকারে বসানোর চেষ্টা হয়েছে। এটা বিবেচনা করে আমরা বেশি বিকল্প রেখেছি।
এতে করে আমাদের জন্য বেশিসংখ্যক দরজা খোলা থাকবে। এখানে বাছাইয়ের দায়িত্বটা সাংবিধানিক কাউন্সিল পালন করবে। তারা বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করে একটি জায়গায় আসার সুযোগ পাবেন। সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ ওই পদে বসানো সম্ভব হবে।
আদালত অন্তর্বর্তী সরকারে বিচার বিভাগকে না জড়াতে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল, তাহলে কেন আবারো বিচার বিভাগকে সুপারিশে আনা হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলেছি। যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, তাতে নির্বাচনে প্রশাসনও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে বাধ্য থাকবে। সব মিলিয়ে আমাদের যেসব সুপারিশ, তাতে এই সরকার দায়িত্ব পালন করলেও বিচার বিভাগকে বিতর্কিত হতে হবে না বলে মনে করছি। এটা বিবেচনা করে আমরা বিচার বিভাগকে রেখেছি। আর কাউকে না কাউকে তো যুক্ত করতেই হবে।
উল্লেখ্য, সংবিধান সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রীয় কার্যাবলিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনা এবং অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনের সুপারিশ করছে।
একটি ‘জাতীয় প্রতিষ্ঠান’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের প্রতিনিধির সমন্বয়ে এটি গঠিত হবে। এর সদস্যরা হবেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, নিম্ন ও উচ্চকক্ষের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, নিম্ন ও উচ্চকক্ষের ডেপুটি স্পিকার এবং সরকারি ও বিরোধী দল ব্যতীত আইনসভার উভয় কক্ষের বাকি সব সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে তাদের মধ্য থেকে মনোনীতে একজন সদস্য। এনসিসির প্রধান কে হবেনÑ সেটা সুপারিশের সারসংক্ষেপে উল্লেখ নেই। তবে সদস্যদের তালিকার প্রথম ক্রমে রয়েছেন রাষ্ট্রপতি।
ইন্টারনেট প্রাপ্তি মৌলিক অধিকার
সংবিধান কমিশন তার সুপারিশে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়টি মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছে। বিদ্যমান সংবিধানের মৌলিক অধিকার খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সঙ্গে নতুন করে মৌলিক অধিকার হিসেবে ইন্টারনেট প্রাপ্তি, তথ্য পাওয়া, ভোটাধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেওয়া, গোপনীয়তা রক্ষা, ভোক্তা সুরক্ষা, শিশু উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে।
বিদ্যমান সংবিধানে বস্ত্র মৌলিক অধিকারের মধ্যে যুক্ত থাকলেও সংস্কার কমিশন তার সুপারিশের সারসংক্ষেপে এ বিষয়টি উল্লেখ করেনি। এ বিষয়টি মৌলিক অধিকারে রয়েছে কি না, তা বিস্তারিত প্রতিবেদন পেলে জানা যাবে।
সুপারিশের ‘মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা’ অংশে জীবনের অধিকার রক্ষায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা, জামিনে মুক্তির অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা এবং নিবর্তনমূলক আটক-সংক্রান্ত বিধান বিলুপ্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়টি মৌলিক অধিকারে যুক্ত করা প্রসঙ্গে সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদ বলেন, অতীতে সরকারকে আমরা কথায় কথায় ইন্টারনেট বন্ধ করতে দেখেছি। এমনকি সরকারপ্রধানও বিভিন্ন সময় ইন্টারনেট সেবা বন্ধের হুমকি দিয়েছেন।
কিন্তু আমরা কাউকে তথ্যহীন রাখতে পারি না। জনগণের মধ্যে তথ্য যোগাযোগের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও আইন করে কিংবা সংবিধানে যুক্ত করে তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আমরাও বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে তা মৌলিক অধিকারে রাখার সুপারিশ করেছি।
বিদ্যমান সংবিধানের মৌলিক অধিকার ‘বস্ত্র প্রাপ্তির অধিকার’ সুপারিশের সারসংক্ষেপে না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যতদূর জানি, বস্ত্র প্রাপ্তির অধিকারটি আমাদের সুপারিশে থাকার কথা। বিষয়টি দেখে বলতে হবে।’