হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

নারী-তরুণরাই হবেন ভোটের ‘গেম চেঞ্জার’

আবু সুফিয়ান ও সাইদুর রহমান রুমী

দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভোটাররা প্রস্তুত। কিন্তু এবার শুধু সংখ্যাই নয়, শক্তির মানেও পরিবর্তন ঘটেছে। রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত, তরুণ ও নারী ভোটারের কণ্ঠ নতুন ইতিহাস গড়ার সম্ভাবনা জাগাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি, নির্বাচনের মাঠে প্রতিটি ভোট শুধু কোনো প্রতীকের জন্য নয়, এটি হয়ে উঠবে মানুষের স্বপ্ন, আশা এবং পরিবর্তনের শক্তি।

এবার নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। তরুণ ভোটাররা আগের সব নির্বাচনের চেয়ে আরো সচেতন। তারা শুধু ভোট দেবেন না; দেশের নীতি, স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নিজেদের শক্তির প্রয়োগও করবেন।

নির্বাচন কমিশনের ২০২৫ সালের চূড়ান্ত তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট নিবন্ধিত ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন এবং নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন এক হাজার ২৩৪ জন। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় ৪৯ দশমিক দুই শতাংশই নারী। খসড়া তালিকার তুলনায় চূড়ান্ত তালিকায় ভোটার বেড়েছে ৮২ হাজার ৭৯৯ জন, যেখানে নারী ভোটার বৃদ্ধির হার (চার দশমিক ১৬ শতাংশ) পুরুষ ভোটার বৃদ্ধির হারকে (দুই দশমিক ২৯ শতাংশ) ছাড়িয়ে গেছে।

যদিও সংখ্যায় নারী-পুরুষ প্রায় সমান, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে এখনো বিশাল ফারাক রয়েছে। গণমাধ্যম বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৮০ জনের কাছাকাছি, যা মোট প্রার্থীর মাত্র চার দশমিক শূন্য চার শতাংশ।

কারা হবেন ‘গেম চেঞ্জার’

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো তরুণ ভোটারদের বিশাল উপস্থিতি ও প্রভাব। ইসির তথ্যানুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সি ভোটার প্রায় পাঁচ কোটি ৫৬ লাখ (৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ)। জাতীয় যুবনীতি ২০১৭ অনুযায়ী, ১৮-৩৫ বছর বয়সি যুব ভোটার প্রায় ৪৫০ লাখ, যা মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ। বয়সভিত্তিক বিস্তারিত বিভাজন হলো ১৮-২১ বছর বয়সি প্রথমবারের ভোটার ৮৫ লাখ, ২২-২৫ বছর বয়সি ১২০ লাখ, ২৬-২৯ বছর বয়সি ১২১ লাখ এবং ৩০-৩৩ বছর বয়সি ১০৬ লাখ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল যুব ভোটার নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে প্রায়শই স্বল্প ব্যবধানে জয়-পরাজয় হয়। তাই তরুণ ভোটারদের সমর্থন যেদিকে যাবে, সেদিকেই পাল্লা ভারী হবে।

বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের (বিওয়াইএলসি) ‘ইয়ুথ ম্যাটারস সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী, ৯৭ দশমিক দুই শতাংশ তরুণ ভোট দিতে ইচ্ছুক। তরুণ ভোটাররা আবেগের চেয়ে ইস্যুভিত্তিক মূল্যায়নে আগ্রহী। তাদের প্রধান অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, শিক্ষার সুযোগ, দুর্নীতি দমন, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী ও ক্যাম্পাস নিরাপত্তা, ডিজিটাল অধিকার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

২০০৮ সাল থেকে পরবর্তী তিনটি সংসদ নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) বিতর্ক, অংশগ্রহণ সংকট ও আস্থাহীনতার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। অনেক তরুণ তখন কার্যকরভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তবে জুলাই-২০২৪-এর গণআন্দোলন ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের পরিস্থিতি ভিন্ন।

এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটার প্রসঙ্গে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আমার দেশকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে প্রতিটি দলের জন্য তরুণ ভোটাররা একটি বিরাট ফ্যাক্টর। জুলাই আন্দোলনে তাদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। তবে দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে পরবর্তী সময়ে তাদের ঐক্যে ফাটল ধরে। তাদের একাংশ এনসিপি গঠন করে, পরে আবার তাদের কেউ কেউ এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে। সবমিলিয়ে অধিকাংশ তরুণ ভোটার যেদিকে যাবে, সেটার ‍ওপর ভোটের ফলাফল নির্ভর করবে।’

তরুণ আইনজীবী ঝুমুর আক্তার আমার দেশকে বলেন, ‘অনেক বছর পর সাধারণ মানুষ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে। অধিকাংশই এবার প্রথম ভোট দেবেন। তাই এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে তরুণ প্রজন্ম মুখিয়ে আছে। তারা এ দেশকে বাসযোগ্য করতে সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি আছে। তাই তরুণ প্রজন্মের মনের ভাষা যারা বুঝতে পারবে—তারাই তাদের সমর্থন পাবে।’

তরুণ প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদ আমার দেশকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটাররা শুধু সংখ্যাগত নয়, গুণগতভাবেও একটি নির্ধারক শক্তি। তারা সংস্কার, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তাকে ভোটের কেন্দ্রে আনছেন। এই ভোটারদের সচেতন অংশগ্রহণ রাজনীতিকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক করতে পারে। তারা শুধু ভোটার নন, তারা পরিবর্তনের চালিকাশক্তি, একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল শাসনের জন্য অটল প্রত্যাশার প্রতীক।’

তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের স্পিরিটের মতো, যেখানে গণমানুষের শক্তি ও ঐক্য উজ্জ্বলভাবে ফুটে ওঠে, এই ভোটাররা আগামী দিনের সুযোগ, সমতা ও ন্যায়বিচারের স্বপ্ন বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশের ভবিষ্যৎকে আরো প্রগতিশীল, স্বচ্ছ ও জনগণমুখী করার পথে এক অনুপ্রেরণামূলক শক্তি হিসেবে দাঁড়াচ্ছেন।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী লিপি কাজী বলেন, ‘আইনজীবী ও সামাজিক কর্মী হিসেবে আমার মনে হয়, এবার নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটাররা খুব গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে। তরুণরা পরিবর্তন চায়, চাকরির সুযোগ চায় এবং জবাবদিহিমূলক রাজনীতি দেখতে চায়। অন্যদিকে নারী ভোটাররা নিরাপত্তা, অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়ের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন হচ্ছেন। এ দুই শ্রেণির ভোটার আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন। যে রাজনৈতিক দল তরুণ ও নারীদের বাস্তব চাহিদা বুঝতে পারবে, তারাই নির্বাচনে এগিয়ে থাকবে।’

বাংলাদেশের নির্বাচনে নারীর উপস্থিতি সংখ্যায় সমান হলেও রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণ সীমিত। অন্যদিকে, তরুণ ভোটাররা নির্বাচনি ফলাফলের ‘কিংমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। তাদের আচরণ, ইস্যুভিত্তিক ভোট, ডিজিটাল রাজনীতি ও রাজনৈতিক সচেতনতা নির্বাচনের ফলাফলে মূল ভূমিকা পালন করবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেই দেখা যাবে এই বৃহৎ শক্তি কীভাবে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন করবে।

আপনার ভোট অন্য কেউ দিলে কী করবেন

দুটি ব্যালটই নিতে হবে, সিল না দিলেও ফেলতে হবে বাক্সে

ভোটে গুরুত্ব পাচ্ছে যেসব ইস্যু

বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য থাকবে বিশেষ নিরাপত্তা

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে মিলবে যেসব সুফল

হাসিনার জালিয়াতির তিন নির্বাচন

৪৩ জেলায় ৭০০০ কিমি ঘুরে নির্বাচনি প্রচার জামায়াত আমিরের

১৯ দিনে তারেক রহমানের ৪৩ জনসভা

ভোট ডাকাতির পথপ্রদর্শক শেখ মুজিব

ঘরে বসেই যেভাবে জানবেন ভোটকেন্দ্র ও বুথের তথ্য