ঘড়ির কাঁটা তখনও ৭টা পেরোয়নি। একটু হালকা শীতের আমেজ। সূর্যের আলোর উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশ। অন্য একটা সাধারণ দিনের মতো মনে হলেও আজকের এদিনটি বিশেষ দিন। শুধু বিশেষই নয়, জাতির ইতিহাসেরও একটি অন্যতম স্মরণীয় একটি দিন। গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় উত্তরণের এক অবিস্মরণীয় দিনের শুরু বলা যেতে পারে আজকের ১২ ফেব্রুয়ারির এইদিন।
মনে হয় পুরো বাংলাদেশ আজকের এইদিনের প্রতীক্ষায় ছিল। সকালে সূর্য্য উঠার অনেক আগেই আজ ঘুম থেকে উঠেছেন অনেকেই। আলসে বলে পরিবারে যে ছেলেটির ‘বদনাম’ রয়েছে সেও আজ সকালে হয়ত অন্যের ঘুম ভাঙ্গিয়েছে! কারণ আজ তো জাতির এমন এক জেগে উঠার দিন; সেদিন কি আর ঘুমিয়ে থাকা যায়!
১৯৯১ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অভিযাত্রা শুরু হয়। নানা সংকট থাকলেও গত ১৬ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। কেড়ে নেওয়া হয় মানুষের মৌলিক অধিকার, ভোটের অধিকার। সে অধিকার ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে অগণিত মানুষকে হত্যা, গুম, নির্যাতন, কারাবরণ করতে হয়। এক দুঃসহ জীবনযাপন করতে হয় এ বদ্বীপের বাসিন্দাদের। চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানে বিদায় নেয় চরম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। ১৪০০ প্রাণের বিনিময়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়। এটাকে অনেকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসাবে মনে করেন। দ্বিতীয় স্বাধীনতা এটি কারও কাছে অত্যুক্তি বলে মনে হলেও বাংলাদেশের মানুষের ভোটের স্বাধীনতা যে ফিরে এসেছে-এ নিয়ে কারও কোনো সংশয় নেই। এ কারণে আজকের এদিনে ভোট দিতে এসে ভোটারদের সে কি উল্লাস!
তারা বলছেন, এমনদিন আবার ফিরে আসবে, সেটা এক সময় কল্পনাও করতে পারিনি। আজ সে কল্পনা বাস্তবে রূপ নিয়েছে! ভোটারদের চোখে মুখে অন্যরকম এক অনুভূতি।
ঢাকা-১৫ আসনের পশ্চিম কাফরুলে হালিম ফাউন্ডেশনের স্কুলে ভোট দেয়ার লাইনে সকাল ৭টায় দাঁড়িয়ে থাকা ভোটার ফজলুর রহমানের কন্ঠে ফুটে উঠেছে সেই উচ্ছ্বাসের প্রতিধ্বনি। ভোট দিতে এসে তার অনুভূতির কথা আমার দেশকে এভাবেই বলেছেন, আজকের এ ভোটের দিন নিয়ে আমি ও আমার পুরো পরিবারই খুবই উচ্ছ্বসিত। সকাল থেকে একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, ভোটাররা কো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়া ভোট দিতে আসছেন। আমরা এমন পরিবেশই চাই। এতো সকালে লাইনে দাঁড়ানোর বিষয়ে বলেন, ভোটের পরিবেশ দেখার জন্য সকালে এসেছি। এখন পরিস্থিতি খুবই সুন্দর ও স্বাভাবিক। এটা বজায় থাকলে আমি ভোট দেয়ার পর আম্মু ও বোনকেও ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ-তে অধ্যয়নরত এ শিক্ষার্থী আরো বলেন, আমরা কোনো ধরনের নিবর্তনমূলক কোনো কিছু চাই না। যখনই কেউ জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে ছাত্ররা তা প্রতিরোধ করেছে, ছাত্ররা সব সময় ন্যায়ের পক্ষে তাদের অবস্থান জানান দিয়েছে।
ওই কেন্দ্রের বাইরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন বিএনপি ও জামায়তের দুই সমর্থক। দুইজনের গলায় দুই প্রার্থীর ছবিসম্বলিত নির্বাচনি কার্ড ঝুলছিল। বেশ হাসিখুশি মনে খোশগল্পে মশগুল দুজন। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রধান দলের সমর্থকদের ভোটের দিনে এমন চিত্র বাংলাদেশে এর আগে খুব বেশি চোখে পড়েছে, এটা বলা যায় না। কিন্তু এবারের ভোটের পরিবেশে এমন সৌহার্দপূর্ণ অবস্থান কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে গেলেই দেখা মিলছে। আলাপে মশগুল থাকা ধানের শীষের সমর্থক মো. সেলিম আমার দেশকে বলেন, আমাদের এখানে কোনো সমস্যা নেই। আমরা সবাই মিলেমিশে ভোট দিচ্ছি। দুইজন দুই দলের সমর্থক কিন্তু তাই বলে আমরা কোনো ধরনের প্রতিহিংসার মধ্যে নেই। প্রত্যেকে যাতে নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে-এমনটাই চাই। নুরুল হাসান নামে দাঁড়িপাল্লার সমর্থকের কন্ঠেও যেন একই কথার প্রতিধ্বনি, আমরা এই প্রথম এমন একটা চমৎকার পরিবেশে ভোট দিচ্ছি। সত্যিই অনেক ভালো লাগছে। যে যার মতো তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছে। ভোটারদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই।
হুমায়ুন কবীর (৫৮) নামে একজন ভোটার আমার দেশকে বলেন, শেখ হাসিনার আমলে আমরা কোনো ভোট দিতে পারিনি। কেন্দ্র দখল করে নিজেরাই নিজেদের পক্ষে ভোট দিয়েছে। সাধারণ ভোটারদের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। সবশেষ ২০১৮ নির্বাচনে ভোট দিতে এসেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্রে আসার পর শুনি আমার ভোট হয়ে গেছে। ফলে ভোট দিতে পারিনি। কিন্ত এবার আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিচ্ছি, কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
আবদুল আলীম (৫৬) নামে একজন ভোটার আমার দেশকে বলেন, সবশেষ ২০০৮ সালে ভোট দিয়েছিলেন। এরপর আর ভোট দিতেই পারেননি। ওই সময়ের পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মিছিল মিটিং পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি। সবকিছু ছিল একটি দলের দখলে। এবার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারছে বলে মন্তব্য করেন এ ভোটার।
মাহবুব আলম (৬১) নামে একজন ভোটারের সঙ্গে কথা হয়। তিনি প্রথম প্রহরেই ভোট দিয়েছেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, গত আওয়ামী লীগ আমলের একটি নির্বাচনেও ভোট দিতে পারিনি। কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই বলেছে, ভোট হয়ে গেছে। কিন্তু এবার ভোটাররা খুবই ভালোভাবে তাদের ভোট দিতে পারছে, সকাল থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা কাজ করছে। আমি খুবই আনন্দিত। তার মেয়ে প্রথমবার ভোটার হয়েছে এবং সেও এ ধরনের পরিবেশে খুব উচ্ছ্বসিত বলে জানান তিনি।