ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠ এখন বেশ সরগরম। আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ সময়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, গণতন্ত্রহীনতা ও রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের প্রতিযোগিতা নয়— বরং দেশের ভবিষ্যৎ পথনকশা নির্ধারণের একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সে কারণে এবারের নির্বাচনে বেশ কিছু ইস্যুতে দলগুলোর অবস্থান ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের মনে যে ইস্যুগুলো দাগ কাটবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গণভোট, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে সংগঠিত গুম-খুন ও জুলাই বিপ্লবে সংগঠিত গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার, আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান, দুর্নীতি দমন ইত্যাদি। এছাড়া গণতন্ত্র, সুশাসন, জবাবদিহি, কর্মসংস্থান, নারীদের জীবনমান উন্নয়ন ইত্যাদি ইস্যুতেও নজর থাকবে ভোটারদের। সে হিসেবে এবারের নির্বাচন শুধু দল বা প্রতীকের লড়াই নয়; বরং এটি নাগরিক জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধান ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে ভোটারদের সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। যে দল বা প্রার্থী এসব জাতীয় ইস্যুতে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত, মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান নিতে পারবে— ভোটারদের পছন্দে তারাই এগিয়ে থাকবেন।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী কাঠামোর কারণে দীর্ঘ সময় নির্বাচনি ব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ছিল, সাধারণ ভোটারের মনে সেটিও গভীর প্রভাব ফেলেছে। সে কারণে ভোটাররা এমন প্রার্থীকে নির্বাচন করবেন, যারা সুষ্ঠু নির্বাচন, শক্তিশালী সংসদ ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গীকার করছে।
দুর্নীতিকে বলা হয় বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে প্রধান অন্তরায়। এ কারণে দ্রব্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সেবা ও অধিকার বঞ্চিত হন নাগরিকরা। সেদিক থেকে ভোটাররা বাস্তব জীবনে দুর্নীতি দমনে যারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে তাদের খুঁজে নেবেন।
রাষ্ট্রসংস্কার প্রসঙ্গও এবারের নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করে, শুধু সরকার পরিবর্তন নয়— রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতেই মৌলিক পরিবর্তন দরকার। যে দলগুলো স্পষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা, সময়সূচি ও বাস্তবায়নের রূপরেখা দিতে পারবে, তারা শিক্ষিত ও সচেতন ভোটারদের আস্থা অর্জনে এগিয়ে থাকবে। এই সংস্কার ইস্যুতে গণভোটে যাদের ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান থাকবে, নিরপেক্ষ ভোটাররা সেদিকেই রায় দেবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের বিষয়টি এবারের নির্বাচনে আবেগঘন ও সংবেদনশীল ইস্যু। যেসব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের কাছে বিচার শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়— এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। এই ইস্যুতে অবস্থান নেওয়ার সময় রাজনৈতিক দলগুলোর ভাষা ও প্রতিশ্রুতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বা অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করবে। বরং স্বচ্ছ তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের কথা যারা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করবে, ভোটাররা তাদেরই পছন্দ করবেন।
আধিপত্যবাদ মোকাবিলার ইস্যুটিও এবারের নির্বাচনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি বরাবরই সংবেদনশীল বিষয়। আধিপত্যবাদী ভারতের চাপিয়ে দেওয়া আওয়ামী দুঃশাসনের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা এখনো মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছে। সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য ও কূটনৈতিক প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। সেটি বিবেচনায় যারা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বাস্তববাদী ও জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারে অবিচল থাকার পাশাপাশি বক্তৃতা ও কর্মকাণ্ডে তা ফুটিয়ে তুলতে পারবে, তারা এই ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে থাকবে। এছাড়া দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, নারী স্বাধীনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের অক্ষুণ্ণতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার ইত্যাদি বিষয় ভোটে বড় নিয়ামক হিসেবে দেখা দিতে পারে।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান আমার দেশকে বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রথম কথা হলো— বাংলাদেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পরিবর্তন, সংস্কার, সুশাসন। তারপরে সন্ত্রাস দমন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এগুলো নির্বাচনি প্রচারে প্রধান ইস্যু হিসেবে স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া প্রায় চার কোটি তরুণ প্রজন্ম ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। এর বাইরে আগামী দিনে যেসব রাজনৈতিক দল নিজেদের গণ্ডির বাইরে এসে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারবে— তাদের জয়ের পাল্লা ভারি হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম বলেন, আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও এবারের ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে। তাদের দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে দল ও প্রার্থীদের সক্ষমতা বিবেচনায় ভোট দেবেন ভোটাররা। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন, নারী-যুবকদের কর্মসংস্থানসহ জাতীয় স্বার্থগুলো কোন রাজনৈতিক দল বেশি খেয়াল করতে পারবে— সেটি ভোটের মাঠে নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।